শাকুর মাহমুদ চৌধুরী | কক্সবাজার জেলা প্রতিনিধি :
কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পগুলোতে ডেঙ্গুর প্রকোপ উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। চলতি বছর এখন পর্যন্ত ক্যাম্পগুলোতে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ছয়জনই শিশু। বাকি চারজন বয়স্ক নারী ও পুরুষ। একই সময়ে ক্যাম্পগুলোতে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে ২ হাজার ৮৮২ জনের শরীরে। এ পরিস্থিতিতে ঘনবসতিপূর্ণ ক্যাম্পগুলোতে জনস্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
কক্সবাজার সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সর্বশেষ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। সোমবার (৫ অক্টোবর) প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর এখন পর্যন্ত পুরো কক্সবাজার জেলায় ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে ৫ হাজার ৩৩ জনের। তাঁদের মধ্যে ৪ হাজার ৬১৫ জনকে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিতে হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় নতুন করে ৩২ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। তাঁদের মধ্যে একজন রোহিঙ্গা। একই সময়ে ২৮ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং চিকিৎসা শেষে ছাড়পত্র পেয়েছেন ২৩ জন।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়ে ১০ জনের মৃত্যু এবং তাঁদের মধ্যে ছয়জন শিশু হওয়ায় পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট হয়েছে। শিশুদের পাশাপাশি বয়স্ক ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের জন্যও ডেঙ্গু মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই জ্বরসহ ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে বিপুলসংখ্যক মানুষের ঘনবসতি, সীমিত বসবাসের জায়গা, অপরিকল্পিত স্থাপনা এবং পানি নিষ্কাশনের সমস্যার কারণে মশার বংশবিস্তারের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে বর্ষা-পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন পাত্র, ড্রাম, পরিত্যক্ত বস্তু ও আশপাশের স্থানে জমে থাকা পানি এডিস মশার প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু মোকাবিলায় শুধু আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা নিশ্চিত করলেই চলবে না; একই সঙ্গে রোগের বিস্তার রোধে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান, পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার উন্নয়ন এবং স্বাস্থ্যসচেতনতা বাড়াতে হবে। ক্যাম্পের প্রতিটি ব্লকে নিয়মিত নজরদারি ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
বিশেষ করে শিশুদের জ্বর, বমি, পেটব্যথা, অস্বাভাবিক দুর্বলতা কিংবা রক্তপাতের মতো সতর্কসংকেত দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন করা জরুরি। একই সঙ্গে ক্যাম্পে পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা এবং রোগীদের দ্রুত রেফার করার ব্যবস্থা কার্যকর রাখতে হবে।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ডেঙ্গুর বিস্তার নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য বিভাগ, ক্যাম্প প্রশাসন, আন্তর্জাতিক ও বেসরকারি সহায়তা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা প্রয়োজন। নিয়মিত ডেঙ্গু পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, আক্রান্তের তথ্য হালনাগাদ, মশার প্রজননস্থল নির্মূল এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কাছে দ্রুত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া এখন গুরুত্বপূর্ণ।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সময়মতো কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া না হলে ক্যাম্পের ঘনবসতিপূর্ণ পরিবেশে ডেঙ্গুর সংক্রমণ আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই শিশুদের জীবন রক্ষা এবং বৃহত্তর জনস্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় জরুরি ও সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
যোগফল | অনলাইন | নিউজ ডেস্ক