বি এম শামিম হাওলাদার ।। ভোলা প্রতিনিধি:
ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলায় হাসান নগর ইউনিয়নের নিজেদের ট্যাক্স কালেক্টর পরিচয় দিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে বসতভিটার কর আদায়ের অভিযোগে একটি চক্রের দুই সদস্যকে আটক করেছে পুলিশ। উপজেলার সাচড়া, কাচিয়া, পক্ষিয়া ও হাসাননগর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় টিনের ঘর থেকে ৩০০ টাকা এবং পাকা ঘর থেকে ৫০০ টাকা করে আদায়ের অভিযোগ উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
আটক ব্যক্তিরা হলেন বগুড়া জেলার সারিয়াকান্দি থানার মো. মজিদুল ইসলাম (৩৮) এবং নীলফামারী জেলার কিশোরগঞ্জ থানার মাহবুব ইসলাম সাগর (২৪)। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, তাদের সঙ্গে অজ্ঞাতনামা আরও ছয় থেকে সাতজন জড়িত থাকতে পারেন। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বিস্তারিত তথ্য নিশ্চিত করা যায়নি।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা নিজেদের ট্যাক্স কালেক্টর পরিচয় দিয়ে বোরহানউদ্দিন উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের বাড়ি বাড়ি গিয়ে বসতভিটার কর দেওয়ার কথা বলে টাকা সংগ্রহ করতেন। টিনের ঘরের জন্য ৩০০ টাকা এবং পাকা ঘরের জন্য ৫০০ টাকা করে আদায় করা হতো বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তবে এসব টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার জন্য আদায় করা হচ্ছিল কি না, কিংবা তাদের কাছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বৈধ অনুমোদন ছিল কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ঘটনার সর্বশেষ পরিস্থিতি তৈরি হয় গতকাল উপজেলার হাসাননগর ইউনিয়নের বিভিন্ন বাড়িতে টাকা সংগ্রহ করতে গেলে। এ সময় স্থানীয় কয়েকজন সচেতন নাগরিক তাদের পরিচয় ও টাকা আদায়ের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তারা কোন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে ট্যাক্স আদায় করছেন এবং আদায় করা টাকা কোথায় জমা দেওয়া হবে, তা জানতে চান। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা এসব প্রশ্নের সন্তোষজনক জবাব দিতে পারেননি। এতে তাদের কার্যক্রম নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়। একপর্যায়ে স্থানীয় বাসিন্দারা তাদের আটকে রাখেন। পরে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাদের উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে গত রাতে তাদের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
এ ঘটনায় আরও অভিযোগ উঠেছে, অভিযুক্তরা স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, প্রশাসক ও সচিবের সঙ্গে যোগসাজশ করে কার্যক্রম চালাতেন। ইউনিয়ন পরিষদের চৌকিদারদের সহযোগিতা নিয়ে তাদের সঙ্গে বিভিন্ন বাড়িতে গিয়ে টাকা আদায় করা হতো বলেও দাবি করেছেন স্থানীয়রা। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধি, কর্মকর্তা কিংবা ইউনিয়ন পরিষদের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি। ফলে এ ঘটনায় সরকারি কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
বাড়ি বাড়ি গিয়ে ট্যাক্স আদায়ের এ অভিযোগ ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। তাদের আশঙ্কা, সরকারি কর্মকর্তা বা ইউনিয়ন পরিষদের লোক পরিচয় দিয়ে কেউ টাকা চাইলে সাধারণ মানুষ সহজেই প্রতারণার শিকার হতে পারেন। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে সরকারি কর আদায়ের নিয়ম সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা না থাকায় অনেকেই পরিচয় যাচাই না করেই টাকা দিয়ে দিতে পারেন। স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের দাবি, সরকারি কর আদায়ের নামে এ ধরনের অনিয়মের অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করতে হবে। একই সঙ্গে কারা টাকা আদায়ের অনুমতি দিয়েছিল, আদায় করা অর্থ কোথায় গেছে এবং এর পেছনে আরও কেউ জড়িত রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে হবে।
স্থানীয়দের মতে, শুধু আটক ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করলেই হবে না; এ ঘটনার সঙ্গে কোনো সংঘবদ্ধ চক্র কিংবা অন্য কারও সম্পৃক্ততা থাকলে তাদেরও শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি যেসব ব্যক্তি টাকা দিয়েছেন, তাদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে আদায় করা অর্থের পরিমাণ নির্ধারণ এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তারা। সরকারি কর বা ফি আদায়ের ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির পরিচয়, কর্তৃপক্ষের অনুমোদন এবং অর্থ জমা দেওয়ার নিয়ম স্পষ্ট করা হলে এ ধরনের প্রতারণা প্রতিরোধ করা সম্ভব বলেও মনে করছেন স্থানীয়রা।
এদিকে, আটক দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার তদন্ত, অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং কথিত চক্রের অন্য সদস্যদের শনাক্ত করার বিষয়টি এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগে আটক ব্যক্তিদের দোষী হিসেবে চূড়ান্তভাবে বিবেচনা করা যায় না। স্থানীয় বাসিন্দারা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।