বাংলাদেশ ও জাপানের সম্পর্ককে আগামী ৩০ থেকে ৫০ বছরের জন্য নতুন অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক অংশীদারত্বের উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বাংলাদেশকে বৈশ্বিক উৎপাদন কেন্দ্রে (ম্যানুফ্যাকচারিং হাব) রূপান্তরের পরিকল্পনা তুলে ধরে জাপানি উদ্যোক্তাদের ব্যাপক বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) জাপানের রাজধানী টোকিওতে দিনব্যাপী বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের বৈঠক, বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক ফোরামে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে এ আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। জ্বালানি, প্রযুক্তি, মহাকাশ গবেষণা, হাইস্পিড রেল ও অবকাঠামোসহ বিভিন্ন খাতে জাপানি বিনিয়োগ আকর্ষণের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
এদিন জাপানের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী, জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) প্রেসিডেন্ট, জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশনের (জেবিআইসি) গভর্নর এবং বিশ্বখ্যাত পোশাক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ইউনিক্লোর শীর্ষ নির্বাহীদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। এসব বৈঠকে বাংলাদেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনা, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি এবং দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের বিষয়ে আলোচনা হয়।
বুধবার টোকিওর জেট্রো হলে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ-জাপান ইকোনমিক ফোরাম ডায়ালগে’ মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে সফররত বাংলাদেশের সরকারপ্রধান দুই দেশের ব্যবসায়ী নেতাদের সামনে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও বিনিয়োগের সুযোগ তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানে জেট্রোর প্রেসিডেন্ট সুসুমু কাতাওকা উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ব্যবসার জন্য নিশ্চয়তা এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য আস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ দুটি বিষয় নিশ্চিত করতে সরকার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরিতে কাজ করছে।
জাপানি কোম্পানিগুলোর তিনটি প্রধান উদ্বেগের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, দক্ষ অবকাঠামো এবং পূর্বানুমানযোগ্য শুল্কায়ন ও করব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এসব সমস্যার কিছু ইতোমধ্যে সমাধান করা হয়েছে এবং বাকি বিষয়গুলো দ্রুত সমাধানে সরকার কাজ করছে।
ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির কথা বিবেচনায় নিয়ে জ্বালানি, প্রযুক্তি ও মহাকাশ গবেষণা এবং এলিভেটেড হাইওয়ে ও হাইস্পিড রেল নেটওয়ার্কে বিনিয়োগের জন্য জাপানি কোম্পানিগুলোর প্রতি বিশেষ আহ্বান জানান তিনি।
বাংলাদেশে বিনিয়োগের বিষয়ে জাপানি উদ্যোক্তাদের আগ্রহের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাপান সরকার, দেশটির জ্যেষ্ঠ নেতৃত্ব ও ব্যবসায়ী মহলের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠকে বাংলাদেশে বিনিয়োগের ব্যাপক সম্ভাবনা দেখা গেছে।
স্বাধীনতার আগে ও পরে বাংলাদেশের পুনর্গঠন এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে জাপানের সহযোগিতার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, জাপানি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী। এ সুযোগ কাজে লাগাতে প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক প্রস্তুতি জোরদার করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাপানি বিনিয়োগ বাড়লে দেশে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে, নতুন শিল্পকারখানা গড়ে উঠবে, যুবসমাজের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে।
দেশ গঠনে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বুধবার স্থানীয় সময় বিকেলে টোকিওর হোটেল নিউ ওতানির হলরুমে জাপানে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশি ও ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান জানান। বাংলাদেশ কমিউনিটি জাপান এ সভার আয়োজন করে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিদেশের মাটিতে প্রতিটি প্রবাসীই বাংলাদেশের একজন প্রতিনিধি বা অ্যাম্বাসেডর। সরকারের পাশাপাশি প্রবাসীরা বাংলাদেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনা ও ইতিবাচক দিকগুলো জাপানি ব্যবসায়ী এবং নীতিনির্ধারকদের কাছে তুলে ধরলে দীর্ঘমেয়াদে দেশ ও দেশের মানুষ উপকৃত হবে।
সভায় প্রবাসীদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তিনি জাপানি ভাষা শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, খেলাধুলার মাধ্যমে শিশুদের বিকাশ, ব্যবসা-বাণিজ্য সহজীকরণ, বন্ধ শিল্পকারখানা চালু, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়ে সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরেন।
সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তারেক রহমান বলেন, শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষে তাত্ত্বিক আলোচনার চেয়ে খেটে খাওয়া ও প্রান্তিক মানুষের উপকারে আসে—এমন সংস্কার এখন বেশি জরুরি।
শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়ন, মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পুনরুদ্ধারের মতো বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানান তিনি। পরিবেশ রক্ষায় আগামী পাঁচ বছরে দেশজুড়ে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
এ ছাড়া বন্ধ মিল-কারখানা পুনরায় চালু করে তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগের কথা উল্লেখ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের প্রতিটি শিশু যেন মানসম্মত শিক্ষা, চিকিৎসাসেবা, পর্যাপ্ত খাবার ও বিশুদ্ধ বাতাস পায়—এ বিষয়ে কারও দ্বিমত থাকার কথা নয়। একটি গণতান্ত্রিক, স্বাবলম্বী ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে প্রবাসী ও দেশবাসীর সহযোগিতা প্রয়োজন।
সরকারের সংস্কার কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এ সময় রাজনৈতিক মতভেদ ভুলে জনকল্যাণমূলক সংস্কার বাস্তবায়নে সবাইকে সমর্থন দেওয়ার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন জাপানের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী আকাজাওয়া রিয়োসেই। বুধবার টোকিওতে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে জাপানের মন্ত্রী বাংলাদেশকে বিনিয়োগের জন্য আকর্ষণীয় দেশ হিসেবে উল্লেখ করেন।
প্রধানমন্ত্রী জাপান সরকারের অব্যাহত সমর্থন ও সহযোগিতার জন্য ধন্যবাদ জানান। দুই দেশের শীর্ষ বৈঠকে আলোচিত সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো এগিয়ে নেওয়া এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদারের বিষয়ে উভয় পক্ষ একমত হয়। জাপানি ব্যবসায়ীদের আগ্রহ কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
জেট্রোর প্রেসিডেন্ট সুসুমু কাতাওকার সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং দুই দেশের বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব জোরদারের বিষয়ে আলোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী।
বাংলাদেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে উন্নত উৎপাদনশিল্প, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি, অটোমোবাইল, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতে জাপানি বিনিয়োগ প্রত্যাশা করেন তিনি। পাশাপাশি বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণে জাপানের সহযোগিতা চান প্রধানমন্ত্রী।
জাপানের বিশ্বখ্যাত পোশাক প্রস্তুতকারক ও খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ইউনিক্লোর মূল কোম্পানি ফাস্ট রিটেইলিংয়ের চেয়ারম্যান, প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তাদাশি ইয়ানাইয়ের নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
এ সময় বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পে বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য ইউনিক্লোকে আহ্বান জানান তিনি। বিশেষ করে কৃত্রিম তন্তু, টেকনিক্যাল টেক্সটাইল ও টেকসই পোশাক উৎপাদন খাতে বিনিয়োগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন প্রধানমন্ত্রী।
বৈঠকে প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা উন্নয়ন, পণ্যে উদ্ভাবন, উন্নত উৎপাদনব্যবস্থা এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদন প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়।
জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশনের (জেবিআইসি) গভর্নর আমাকাওয়া কাজুহিকোর সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের জ্বালানি, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি এবং অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদারের বিষয়ে আলোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে জেবিআইসির সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তারেক রহমান বলেন, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে সরকার ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং বিভিন্ন বিধিবিধান সংস্কার ও সহজীকরণের উদ্যোগ নিয়েছে। বিনিয়োগবান্ধব নীতি প্রণয়ন ও ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নয়নে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলেও জানান তিনি।
জাপানের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী, জেট্রোর প্রেসিডেন্ট, ইউনিক্লোর শীর্ষ নির্বাহী এবং জেবিআইসির গভর্নরের সঙ্গে পৃথক বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাত, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-১ হুমায়ুন কবির, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ড. শাকিরুল ইসলাম খান এবং অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমনসহ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
প্রবাসীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য আবদুস সাত্তার পাটোয়ারি, প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান, মন্ত্রী, উপদেষ্টা ও সফরসঙ্গীদের পাশাপাশি জাপান বিএনপির নেতারা এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রবাসী বাংলাদেশিরা উপস্থিত ছিলেন।
তুলি আক্তার/ অনলাইন ডেস্ক / যোগফল.কম