৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতন হলেও ফ্যাসিবাদ, স্বৈরাচার ও দুর্নীতিবাজ শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই শেষ হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, মাদক কারবারে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও সরকারের ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও জ্বালানিমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেছেন তিনি।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) দুপুরে রাজবাড়ী পৌর মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন নাহিদ ইসলাম।
তিনি বলেন, গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের রাজনীতি বাংলাদেশ থেকে চিরতরে বন্ধ হয়েছে। ছাত্র-তরুণসহ দেশের মানুষ জীবন ও রক্তের বিনিময়ে আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটিয়েছে। তবে এখনো ফ্যাসিবাদের দোসররা বিভিন্ন জায়গায় রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধেও লড়াই অব্যাহত রয়েছে।
নাহিদ ইসলাম বলেন, গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় সংস্কার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী হওয়ার প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু সরকারের কর্মকাণ্ডে সেই প্রত্যাশা পূরণ হচ্ছে না। বরং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, দুর্নীতি, মূল্যস্ফীতি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের অভিযোগ সামনে আসছে।
ক্ষমতাসীন বিএনপির ছত্রচ্ছায়ায় একটি অংশ বেপরোয়া হয়ে উঠেছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, দলীয় প্রভাব খাটিয়ে সাধারণ মানুষের ওপর নির্যাতন-নিপীড়নের ঘটনাও ঘটছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশকে নিরপেক্ষ, শক্তিশালী ও জনবান্ধব হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
পুলিশের ক্রসফায়ারসংক্রান্ত বক্তব্যের সমালোচনা করে এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে শক্তিশালী করার অর্থ আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা নয়। পুলিশকে রাজনৈতিক চাপমুক্ত থেকে আইন অনুযায়ী কাজ করার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। ক্ষমতাসীন দলের কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কারণে কোনো পুলিশ কর্মকর্তাকে যেন বদলি বা পদাবনতি করা না হয়, সে নিশ্চয়তাও দিতে হবে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমালোচনা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নেতৃত্ব দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। মাদক কারবার ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ তুলে তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও জ্বালানিমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেন।
মাদক কারবার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া মাদকের সিন্ডিকেট টিকে থাকতে পারে না। আগে আওয়ামী লীগের নেতাদের বিরুদ্ধে পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ ছিল, এখন বিএনপির নেতাদের বিরুদ্ধেও একই ধরনের অভিযোগ উঠছে।
নাহিদ ইসলামের অভিযোগ, মাদকবিরোধী অভিযানে অনেক ক্ষেত্রে খুচরা বিক্রেতা ও মাদকসেবীদের গ্রেপ্তার করা হলেও সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। মাদক কারবারের মূল চক্র ভাঙতে রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ, প্রশাসন ও পুলিশের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
সাংবাদিকদের ওপর হামলা, হয়রানি ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়ার অভিযোগ তুলে এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, সত্য প্রকাশের কারণে সাংবাদিকদের নির্যাতনের শিকার হওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁর দল সব সময় গণমাধ্যমের স্বাধীনতার পক্ষে থাকবে।
দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, দ্রব্যমূল্য ও জ্বালানির দাম বাড়লেও মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত, শ্রমিক এবং বেসরকারি খাতের কর্মীদের আয় সেই অনুপাতে বাড়েনি। এ সময় পোশাকশ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবি জানান তিনি। পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এবং ঋণখেলাপি ও অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।
সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দলীয়করণের অভিযোগ তুলে নাহিদ ইসলাম বলেন, সরকারি চাকরিতে দলীয়করণ, প্রশ্নফাঁস এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের পদত্যাগে বাধ্য করার মতো ঘটনা উদ্বেগজনক। তথ্য কমিশনের নেতৃত্ব নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর মতে, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত না হলে গণতন্ত্র কার্যকর হবে না।
গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি প্রসঙ্গে এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন চুক্তিতে পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করতে গ্যারান্টি ক্লজ থাকা জরুরি। পদ্মা ও গঙ্গা নদীকে ঘিরে সরকারের পরিকল্পনা স্পষ্ট নয় উল্লেখ করে এ বিষয়ে সংসদে বিশেষ অধিবেশন আয়োজনের দাবি জানান তিনি।
নাহিদ ইসলাম বলেন, গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির সঙ্গে দেশের কৃষি, পরিবেশ ও নদীতীরবর্তী কয়েক কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা জড়িত। তাই পানির ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জাতীয় নির্বাচনের সময়কার জোট থাকলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এনসিপি আলাদাভাবে অংশ নেবে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন নিয়ে সংশয় রয়েছে। নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করে নির্বাচনের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরির আহ্বান জানান তিনি।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হয়নি উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, গণঅভ্যুত্থানের দাবি অনুযায়ী সংস্কার, গণহত্যার বিচার, তরুণদের কর্মসংস্থান, দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব এবং নদীর পানির ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, “আমাদের ঐক্য হচ্ছে দেশের জনগণের সঙ্গে। আমরা জনগণকে সঙ্গে নিয়েই সামনের দিকে এগিয়ে যাব।” গণবিরোধী নীতি থেকে সরকার সরে না এলে সরকারের সঙ্গে সহযোগিতা বা ঐক্যের সুযোগ থাকবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব ও রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য সারজিস আলম, যুগ্ম আহ্বায়ক ও রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য আরিফুল ইসলাম আদীব, ঢাকা দক্ষিণ বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ হোসাইন, সহসাংগঠনিক সম্পাদক হাসিবুর রহমান অপু, সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক সাইয়েদ জামিলসহ দলের স্থানীয় নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
তুলি আক্তার/ অনলাইন ডেস্ক / যোগফল.কম