ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মনজুর কাদের ভূঁইয়াকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দিয়েছে চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতি। পুলিশের চাকরিতে যোগ দেওয়ার পরও সমিতির সদস্যপদ বহাল রাখার অভিযোগে তাকে এ নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির নথি অনুযায়ী, ২০০২ সাল থেকে মনজুর কাদের সমিতির সদস্য। তবে পুলিশের চাকরিতে যোগ দেওয়ার আগেই সদস্যপদ স্থগিতের আবেদন করেছিলেন বলে দাবি করেছেন তিনি। নোটিশের জবাবে লিখিত ব্যাখ্যার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও জমা দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন ওসি।
বিষয়টি নিশ্চিত করে চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মঈনুদ্দীন জানান, স্থানীয় সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানার সঙ্গে সরাইল থানার ওসির বাদানুবাদের ঘটনার পর তাঁর আইনজীবী সমিতির সদস্যপদের বিষয়টি নজরে আসে। এরপর চার দিন আগে তাঁকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়।
মঈনুদ্দীন বলেন, পুলিশের চাকরিতে নিয়োজিত থেকে আইনজীবী সমিতির সদস্যপদ সক্রিয় রাখার বিষয়টি সমিতির বিধিবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অন্য পেশায় নিয়োজিত থেকেও সদস্যপদ বহাল রেখেছেন, এমন ব্যক্তিদের শনাক্ত করার কাজ চলছে। পর্যায়ক্রমে তাঁদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সদস্যপদ স্থগিতের নির্দেশনা
আইন পেশায় নিয়মিত যুক্ত না থেকেও সদস্যপদ বহাল রাখা ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে সম্প্রতি উদ্যোগ নেয় চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতি। এ লক্ষ্যে গত ২৫ জুন একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। এতে সরকারি, আধা সরকারি, বেসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, বীমা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত সদস্যদের ৩০ জুলাইয়ের মধ্যে স্বেচ্ছায় সদস্যপদ স্থগিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সমিতির গঠনতন্ত্রের পরিচ্ছেদ ৩-এর ৭(১) বিধি অনুযায়ী, আইন বিষয়ে শিক্ষকতা এবং কোনো প্রতিষ্ঠানে আইন কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ব্যক্তিরা প্রয়োজনীয় প্রমাণপত্র জমা দিয়ে সদস্যপদ বহাল রাখতে পারবেন। এর বাইরে অন্য পেশায় নিয়োজিত সদস্যদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নিষ্ক্রিয় সদস্যদের শনাক্ত করতে নাম-ঠিকানাসহ তথ্য অভিযোগ বাক্সে জমা দেওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়।
হাইকোর্টে রিট আবেদন
আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত থেকেও অন্য পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি উচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। গত ২৬ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফরহাদ উদ্দিন আহমেদ ভূঁইয়া এ বিষয়ে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করেন।
রিটে আইন পেশার সনদ নিয়ে চাকরি, ব্যবসা কিংবা অন্য পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে।
রিটকারী আইনজীবীর দাবি, এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে তিনি ২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি বাংলাদেশ বার কাউন্সিলে আবেদন করেছিলেন। তবে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ না পাওয়ায় প্রথমে আইনি নোটিশ পাঠান। এরপরও সাড়া না পেয়ে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন।
রুমিন ফারহানার সঙ্গে বাদানুবাদ
সম্প্রতি সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানার সঙ্গে সরাইল থানার ওসি মনজুর কাদের ভূঁইয়ার বাদানুবাদের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
গত ২২ অক্টোবর রাতে দুর্গাপূজার মণ্ডপ পরিদর্শনে পুলিশি নিরাপত্তা না পাওয়া এবং ওসির বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ নিয়ে কথা বলতে থানায় যান রুমিন ফারহানা। সেখানে দুজনের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়।
এ সময় রুমিন ফারহানার সঙ্গে থাকা এক ব্যক্তি ওসির বিরুদ্ধে তাঁর কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ করেন। তবে অভিযোগ অস্বীকার করেন ওসি। ওই ব্যক্তিকে রুমিন ফারহানা শিখিয়ে থানায় এনেছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
একপর্যায়ে ওসিকে উদ্দেশ করে রুমিন ফারহানা বলেন, ‘আপনি তো বিরাট আওয়ামী লীগ ছিলেন। আপনার হিস্ট্রি তো আমি জানি স্যার। যাই হোক, সেটা নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই।’
বাদানুবাদের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়। এ ঘটনায় পুলিশের করা সাধারণ ডায়েরি (জিডি) নিয়েও আলোচনা হয়।
পরে ২৪ অক্টোবর সাংবাদিকদের কাছে দেওয়া লিখিত বক্তব্যে রুমিন ফারহানা বলেন, এ ঘটনায় মামলা হলে তাঁকে যেন প্রধান আসামি করা হয়। ওই বাদানুবাদের ঘটনার পরই সামনে আসে ওসি মনজুর কাদের ভূঁইয়ার চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্যপদের বিষয়টি।
তুলি আক্তার/ অনলাইন ডেস্ক / যোগফল.কম