বাবা নেই, তবু জন্মদিনে স্মৃতিতে আইয়ুব বাচ্চু
আয়ুব বাচ্চু নেই আট বছর। তবু ১৬ আগস্ট এলেই পরিবারে ফিরে আসে প্রিয় মানুষটির অসংখ্য স্মৃতি। একসময় এই দিনটি ঘিরে বাড়িতে থাকত কেক কাটার আয়োজন, পছন্দের খাবার আর স্বজন-বন্ধুদের আনাগোনা। এখন সেই মানুষটি নেই; আছে শুধু তাঁর রেখে যাওয়া স্মৃতি আর গভীর শূন্যতা।
আইয়ুব বাচ্চুর স্ত্রী ফেরদৌস আক্তার, ছেলে আহনাফ তাজওয়ার আইয়ুব ও মেয়ে ফাইরুজ সাফরা আইয়ুব প্রতিবছরই নিজেদের মতো করে বাবার জন্মদিন স্মরণ করেন। কেকও কাটেন। তবে সেই আনন্দের সঙ্গে মিশে থাকে না-পাওয়ার বেদনা ও চোখের পানি।
ছেলে আহনাফ তাজওয়ার স্ত্রীকে নিয়ে কানাডার ভ্যাঙ্কুভারে এবং মেয়ে ফাইরুজ সাফরা স্বামীর সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে বসবাস করেন। স্ত্রী ফেরদৌস আক্তার বাংলাদেশে থাকেন এবং সুযোগ পেলে সন্তানদের কাছে গিয়ে সময় কাটান। দূরদেশে থাকলেও ১৬ আগস্ট এলেই তিনজনের মনেই ফিরে আসে একই মানুষ—তাদের ‘বাবুই’।
একসময় জন্মদিন মানেই ছিল উৎসব
বেঁচে থাকতে নিজের জন্মদিনে স্ত্রী-সন্তানদের সঙ্গে সময় কাটাতেই বেশি পছন্দ করতেন আইয়ুব বাচ্চু। সন্তানরা ছোট থাকাকালে বাড়িতেই জন্মদিনের আয়োজন হতো। কেক কাটার পাশাপাশি রান্না হতো তাঁর পছন্দের খাবার।
পরবর্তীতে সন্তানরা বড় হলে জন্মদিনের আয়োজনের ধরনও বদলে যায়। স্টুডিওতে বন্ধু ও সংগীতজগতের সহযাত্রীদের সঙ্গে কেক কাটতেন তিনি। গান, আড্ডা ও আনন্দে জমে উঠত পুরো আয়োজন। একই সঙ্গে পরিবারের জন্য বাসাতেও খাবার পাঠিয়ে দিতেন।
তবে ২০০০ সালে আইয়ুব বাচ্চুর মা মারা যাওয়ার পর বদলে যায় জন্মদিন নিয়ে তাঁর অনুভূতিও। ফেরদৌস আক্তারের ভাষ্য, মা-অন্তঃপ্রাণ বাচ্চু এরপর আর আগের মতো জন্মদিন নিয়ে উচ্ছ্বাস দেখাতেন না। আনুষ্ঠানিকতার অংশ হিসেবে কেক কাটলেও দিনটিতে আগের মতো আনন্দ থাকত না।
সন্তানদের কাছে ছিলেন বন্ধুর মতো
আইয়ুব বাচ্চুর সঙ্গে তাঁর ছেলে-মেয়ের সম্পর্ক ছিল বন্ধুর মতো। দুজনকেই গিটার শেখানোর পাশাপাশি স্বপ্ন দেখতেন, একদিন সন্তানদের সঙ্গে একই মঞ্চে দাঁড়িয়ে গিটার বাজাবেন।
ছেলে তাজওয়ারকে বাবার সঙ্গে এক মঞ্চে গিটার বাজাতে দেখা গেলেও মেয়েকে নিয়ে সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। বাবাকে ‘বাবুই’ বলে ডাকতেন ফাইরুজ সাফরা।
বাবার স্মৃতিচারণ করে সাফরা জানিয়েছেন, মানুষ হিসেবে বাবাকে ঘরে যেমন দেখতেন, মঞ্চেও তাঁকে তেমনই আলাদা এক জগতে ডুবে যেতে দেখেছেন। ছোট্ট গিটার হাতে নিয়ে জ্যামিং করতে করতে তিনি যেন নিজের ভুবনে হারিয়ে যেতেন।
মেয়ের হাতেও গিটার তুলে দিয়েছিলেন আইয়ুব বাচ্চু। সাফরা তখন ও লেভেলে পড়তেন। তাঁর জন্য একটি গিটার এনে দিয়ে বাবা বলেছিলেন, একদিন তিনি বাবার সঙ্গে মঞ্চে গিটার বাজাবেন। কিন্তু সেই দিন আর আসেনি।
২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবর ৫৬ বছর বয়সে আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যু হয়। এরপর তাঁর সন্তানদের জীবনের বড় অপূর্ণতাগুলোর একটি হয়ে থাকে বাবার সঙ্গে পূর্ণাঙ্গভাবে একই মঞ্চে দাঁড়াতে না পারা।
জন্মদিনে আরও বেশি মনে পড়ে বাবাকে
সময়ের সঙ্গে সন্তানরা বড় হয়েছেন, নিজেদের সংসার গড়েছেন এবং দেশের বাইরে স্থায়ী হয়েছেন। তবুও বাবার স্মৃতি তাদের জীবন থেকে কখনো দূরে যায়নি।
১৬ আগস্ট এলেই পরিবারের সদস্যদের মধ্যে পুরোনো গল্প উঠে আসে। ফোনে কথা বলার সময় বাবার প্রসঙ্গ উঠলে এখনও আবেগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। মা-সন্তানের কথোপকথনে ফিরে আসে আইয়ুব বাচ্চুর নানা স্মৃতি।
বাবা নেই, কিন্তু জন্মদিনে কেক কাটা এখনও বন্ধ হয়নি। তবে সেই কেকে আগের মতো উৎসবের উচ্ছ্বাস নেই। কেক কাটার পর কেউ নীরবে স্মৃতিতে ডুবে থাকেন, কারও চোখে আসে পানি। তারপর আবার সবাই ফিরে যান নিজেদের জীবনে।
গানে-গিটারে বেঁচে আছেন আইয়ুব বাচ্চু
এবারও আইয়ুব বাচ্চুর জন্মদিন উপলক্ষে তাঁকে স্মরণ করে প্রকাশিত হচ্ছে ‘উত্তরাধিকার’ শিরোনামের একটি অ্যালবাম। এতে তাঁর গাওয়া ২০টি গান নতুন সংগীতায়োজনে পরিবেশন করছেন দেশের বিভিন্ন ব্যান্ড ও একক শিল্পী।
অ্যালবামে দলছুট গেয়েছে ‘রুপালি গিটার’, আরবোভাইরাস ‘নীল বেদনা’, সোনার বাংলা সার্কাস ‘গতকাল রাতে’, শুভযাত্রা ‘চলো বদলে যাই’, ক্যালিপসো ‘চাঁদ মামা’, রকসল্ট ‘অচেনা জীবন’, ডোপামিন ‘মাধবী’ এবং এ কে রাহুল গেয়েছেন ‘মন চাইলে মন’। আরও কয়েকটি জনপ্রিয় গান থাকছে একক শিল্পীদের কণ্ঠে। সব গানের মাস্টারিং করেছেন ইকবাল আসিফ জুয়েল।
শিল্পী চলে গেছেন, কিন্তু থামেনি তাঁর গান ও গিটারের সুর। নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের কণ্ঠে বারবার ফিরে আসছে তাঁর সৃষ্টি। ভক্তদের ভালোবাসায় তিনি আজও বেঁচে আছেন।
পরিবারের কাছে অবশ্য তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় কিংবদন্তি গায়ক বা গিটারিস্ট নয়—তিনি এখনও তাদের কাছে সেই আপন মানুষ, ‘বাবুই’।
স্বপ্ন এগিয়ে নিতে ফাউন্ডেশন
আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যুর পর তাঁর স্বপ্ন ও সৃষ্টিশীলতার উত্তরাধিকার ধরে রাখতে কাজ করছে আইয়ুব বাচ্চু ফাউন্ডেশন। ২০২০ সালে কার্যক্রম শুরু করা এই ফাউন্ডেশন আনুষ্ঠানিকভাবে নিবন্ধিত হয় গত বছরের ৯ জুলাই।
আইয়ুব বাচ্চু শারীরিকভাবে না থাকলেও তাঁর গান, গিটার এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ছে। আর তাই ১৬ আগস্ট শুধু তাঁর জন্মদিন নয়—ভক্ত ও পরিবারের কাছে এটি প্রিয় এক মানুষকে নতুন করে স্মরণ করার দিন।
সাদিয়া পারভিন / অনলাইন ডেস্ক / যোগফল.কম

আপনার মতামত লিখুন