‘ধর্মীয় কারণে নয়’, নদী ভাঙন ও কৃষকের ধান রক্ষায় নৌকাবাইচ বন্ধের দাবি
যোগফল প্রতিবেদক:
সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার সুনাই নদীতে আগামী ২৮ আগস্ট অনুষ্ঠেয় নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা বন্ধের দাবি নিয়ে আলোচনা চলছে। কয়েকটি গণমাধ্যমে ‘তৌহিদী জনতা’ নামের একটি সংগঠনের পক্ষ থেকে নৌকাবাইচ বন্ধের দাবি জানানোর খবর প্রকাশের পর বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
তবে নৌকাবাইচ বন্ধের দাবিতে যুক্ত ব্যক্তিদের কয়েকজন জানিয়েছেন, এর পেছনে কোনো ধর্মীয় কারণ নেই। বরং নদীভাঙন ঠেকানো, নদীর দুই তীরে থাকা কৃষিজমি ও ধানের ক্ষতি রোধ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনায় তারা এ আয়োজন বন্ধের দাবি জানিয়েছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার
নৌকাবাইচ বন্ধের দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু করেন স্থানীয় যুবক মাসুম বিন নুর উদ্দিন। গত ১৮ আগস্ট রাতে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি পোস্টার প্রকাশ করেন তিনি। সেখানে ‘তৌহিদী জনতা লাউতা ইউনিয়ন’ নামটি দেখা যায়।
পরে আরেকটি পোস্টারে ‘সুনাই নদীতে আগত নৌকাবাইচ বন্ধের প্রতিবাদে পরামর্শ সভা’ লেখা হয়। সেখানে সবাইকে সভায় উপস্থিত হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছিল।
তবে শনিবার (২২ আগস্ট) বিকেলে কালবেলা অনলাইনের সঙ্গে ফোনে কথা বলার সময় মাসুম বিন নুর উদ্দিন দাবি করেন, পোস্টারে ‘নৌকাবাইচ বন্ধের প্রতিবাদে’ কথাটি ভুল করে লেখা হয়েছিল। তাঁর ভাষ্য, তিনি ব্যক্তিগতভাবে নৌকাবাইচ বন্ধের পক্ষে, তবে এর সঙ্গে ধর্মীয় কোনো বিষয় জড়িত নয়। নদীভাঙন ঠেকানো এবং কৃষকদের ধান রক্ষার বিষয়টিই তাঁর মূল উদ্বেগ।
পরে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে ওই পোস্টারটি সরিয়ে নেন। তাঁর দাবি, পরামর্শ সভার আয়োজকেরাই তাঁকে পোস্টার তৈরির দায়িত্ব দিয়েছিলেন।
সভায় নদীভাঙন ও কৃষকের ক্ষতির বিষয়টি উঠে আসে
গত ২০ আগস্ট বারিগ্রাম বাজার মসজিদে নৌকাবাইচ বন্ধের দাবিতে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা শেষে স্থানীয় আলেম ও মুরব্বিদের বক্তব্য নিয়ে একটি ভিডিও প্রকাশ করেন মাসুম বিন নুর উদ্দিন। ভিডিওটি ‘মুক্ত বাতাস’ নামের একটি ফেসবুক পেজে প্রকাশ করা হয়।
ভিডিওতে দেওয়া বক্তব্যগুলোর বড় অংশজুড়ে নদীভাঙন, কৃষকের ধান রক্ষা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয় উঠে আসে। কোথাও কোথাও ধর্মীয় অবস্থানের কথা বলা হলেও নৌকাবাইচকে সরাসরি ধর্মবিরোধী হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি।
সভায় নৌকাবাইচকে কেন্দ্র করে জুয়ার আসর বসার অভিযোগও তোলা হয়। পাশাপাশি অতীতে নৌকাবাইচ ও সংশ্লিষ্ট আয়োজনকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ এবং হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে বলে দাবি করা হয়।
স্থানীয় এক আলেম বলেন, এলাকার পরিবেশ সুন্দর রাখা, বিশৃঙ্খলা থেকে রক্ষা এবং নদীভাঙন ঠেকানোর স্বার্থে নৌকাবাইচ বন্ধ করা প্রয়োজন।
‘এটি ধর্মীয় নয়, সামাজিক ও জনস্বার্থের বিষয়’
প্রবীণ আলেম মাওলানা নুরুর রহমান মাসুক বলেন, নৌকাবাইচ বন্ধের দাবি কোনো ধর্মীয় বিষয় নয়; এটি সামাজিক ও জনস্বার্থের বিষয়।
তিনি বলেন, ‘তৌহিদী জনতা’ কিংবা নাগরিক সমাজের নামে কারা ব্যানার করেছে, সে বিষয়ে তাঁরা নিশ্চিত নন। তবে এলাকার সচেতন নাগরিকদের মূল দাবি হলো, ওই এলাকায় আর নৌকাবাইচ আয়োজন না করা।
তাঁর দাবি, অতীতে নৌকাবাইচকে কেন্দ্র করে দুই নৌকার সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে অনেকে আহত হয়েছেন। এ ছাড়া নৌকাবাইচের পাশের এলাকায় গানের আসরকে কেন্দ্র করে গুরুতর অপরাধের ঘটনাও ঘটেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
নৌকাবাইচের পক্ষেও মত
তবে স্থানীয়দের একটি অংশ নৌকাবাইচ বন্ধের দাবির সঙ্গে একমত নয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন স্থানীয় ব্যক্তি বলেন, নৌকাবাইচ আয়োজনের কারণে নদীর বড় ধরনের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা নেই। জুয়ার আসর বসলে তা বন্ধ করার দায়িত্ব প্রশাসনের।
তাঁদের মতে, নৌকাবাইচ একটি ঐতিহ্যবাহী আয়োজন। কোনো অনিয়ম বা অপরাধের আশঙ্কা থাকলে তা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা না করে পুরো আয়োজন বন্ধ করে দেওয়া সমাধান নয়।
ফলে সুনাই নদীর নৌকাবাইচকে ঘিরে একদিকে কৃষিজমি রক্ষা, নদীভাঙন ও আইনশৃঙ্খলার বিষয় তুলে ধরে আয়োজন বন্ধের দাবি উঠেছে, অন্যদিকে স্থানীয়দের একটি অংশ এটিকে ঐতিহ্যবাহী আয়োজন হিসেবে চালু রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে এলাকায় দুই ধরনের মত তৈরি হয়েছে।
তানজিলা / অনলাইন
ডেস্ক / যোগফল.কম

আপনার মতামত লিখুন