দেড় কিলোমিটার সড়কে ৪০ হাজার মানুষের দুর্ভোগ, গর্তে ভরা চলাচলের পথ
ছবি সংগৃহীত
নিজস্ব প্রতিবেদক:
মাত্র দেড় কিলোমিটার সড়ক। অথচ এই পথ পাড়ি দিতে প্রতিদিন ভোগান্তিতে পড়ছেন প্রায় ৪০ হাজার মানুষ। কোথাও উঠে গেছে কার্পেটিং, কোথাও বেরিয়ে এসেছে ইটের খোয়া। আবার কোথাও তৈরি হয়েছে বড় বড় গর্ত। ভেঙে গেছে সড়কের পাড়ও। ফলে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে শিক্ষার্থী, রোগী, অটো-ভ্যানচালকসহ সাধারণ মানুষকে।
কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়নের সিঙ্গারডাবড়ীহাট বাজার থেকে কুড়ারপাড় বাজার পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার সড়কের এমনই বেহাল দশা। সরেজমিনে দেখা গেছে, সড়কটির বিভিন্ন স্থানে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৪০টি গর্ত রয়েছে। বর্ষায় এসব গর্তে পানি জমে সড়কটি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। আর শুষ্ক মৌসুমে যানবাহন চলাচলের সময় ধুলায় দুর্বিষহ হয়ে পড়ে পুরো এলাকা।
স্থানীয়দের ভাষ্য, বিদ্যানন্দ, ঘড়িয়ালডাঙ্গা ও রাজারহাট সদর ইউনিয়নের প্রায় ৩০টি গ্রামের মানুষ এই সড়ক ব্যবহার করেন। সিঙ্গারডাবড়ীহাট বাজারের সঙ্গে যোগাযোগের পাশাপাশি ঘড়িয়ালডাঙ্গা, কানুরাম, রামপাড়া, চেতনা, কুড়ারপাড়, কামারপাড়া, রতিগ্রাম, চতুরা, দিনা ও বিজলীর বাজারসহ বিভিন্ন এলাকার মানুষের যাতায়াতের অন্যতম পথ এটি।
ভাঙা সড়কে দুর্ভোগ চরমে
কুড়ারপাড় এলাকার বাসিন্দা হারুন মিয়া বলেন, ‘রাস্তা দিয়ে মোটরসাইকেল চালালে মনে হয় পাহাড়ে ওঠানামা করছি। কোমরের অবস্থা খারাপ হয়ে যায়।’
চেতনা গ্রামের বাসিন্দা মোছা. হামিদা বেগম বলেন, ‘এই রাস্তা দিয়ে গেলে ঝাঁকুনিতে অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। অটোতে যাতায়াত করলে মনে হয় কোমর ভেঙে যাবে। একদিন এই রাস্তা দিয়ে গেলে সাত দিন কোমরে ব্যথা থাকে।’
সড়কটির বেহাল অবস্থায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন অটো ও ভ্যানচালকেরা। তাদের দাবি, ভাঙাচোরা সড়কের কারণে যানবাহনের ক্ষতি হচ্ছে এবং বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি। অনেক চালক এই পথে যেতে অনীহা প্রকাশ করেন।
চৌকিদারপাড়ার অটোচালক রায়হান বাদশা বলেন, ‘আগে এই রাস্তা দিয়ে ভাড়া মারতাম। এখন আর যাওয়া যায় না। গেলেও বেশি ভাড়া নিতে হয়। কিন্তু উপায় নেই। যাওয়া-আসার পথে দুর্ঘটনা ঘটলে কী হবে?’
ভ্যানচালক মোসলেম উদ্দিন বলেন, ‘এই রাস্তা দিয়ে মালামাল নিয়ে যাওয়া খুব কষ্টকর। পুরো রাস্তা ভাঙা। গাড়ি উল্টে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।’
ঝুঁকি নিয়ে স্কুলে যাচ্ছে শিক্ষার্থীরা
এই সড়ক ব্যবহার করে প্রতিদিন ছয়টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত করে প্রায় ১ হাজার ১০০ শিক্ষার্থী। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো সিঙ্গারডাবড়ীহাট বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়, সিঙ্গারডাবড়ীহাট বালিকা উচ্চবিদ্যালয়, শিশু নিকেতন স্কুল, এডুকেয়ার প্রি-ক্যাডেট স্কুল, সিঙ্গারডাবড়ীহাট দাখিল মাদ্রাসা ও পাটোয়ারীপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কেউ সাইকেলে, কেউ অটোতে, আবার কেউ হেঁটে বিদ্যালয়ে যাতায়াত করে। তাদের অনেকে সিঙ্গারডাবড়ীহাট এলাকায় প্রাইভেট ও কোচিং পড়তে যায়। ফলে দিনে দুই থেকে চারবার পর্যন্ত এই সড়ক ব্যবহার করতে হয় তাদের। ভাঙাচোরা রাস্তার কারণে প্রতিদিনই ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে।
সিঙ্গারডাবড়ীহাট বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী নন্দিতা কর্মকার বলে, ‘আমি সাইকেলে যাতায়াত করি। রাস্তায় ভাঙাচোরা বেশি থাকায় যেতে কষ্ট হয়। মাঝে মাঝে সাইকেলের চাকাও পাংচার হয়ে যায়।’
একই শ্রেণির শিক্ষার্থী লামিয়া বলে, ‘আমার সাইকেল নেই। অটোতে কুড়ারপাড় পর্যন্ত যেতে হয়। রাস্তা ভাঙা থাকায় অটো যেতে চায় না। মাঝে মাঝে অটো না পেলে হেঁটে যেতে হয়।’
ভারী যানবাহনে ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক
স্থানীয়দের অভিযোগ, হ্যাচারিরপাড় এলাকায় আগে ইটভাটা ছিল। এ কারণে দীর্ঘদিন ধরে এই সড়ক দিয়ে অতিরিক্ত ওজনের ভারী যানবাহন চলাচল করেছে। এতে সড়কের ওই অংশ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তাদের আশঙ্কা, দ্রুত সংস্কার করা না হলে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে সড়কটি পুরোপুরি চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়তে পারে। তাই জনদুর্ভোগ কমাতে দ্রুত সড়কটি সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন তারা।
ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল কুদ্দুস প্রামাণিক বলেন, ‘আমি মাসিক সভায় একাধিকবার এই রাস্তাটির বিষয়টি উত্থাপন করেছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত এর কোনো সুফল পাওয়া যায়নি।’
এ বিষয়ে রাজারহাট উপজেলা প্রকৌশলী মো. এজাহারুল হক জানান, এক বছর আগে সড়কটি আম্পান প্রকল্পের আওতায় সংস্কারের জন্য প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। তবে বিলম্ব হওয়ায় পুনরায় সড়কটি যৌথ প্রকল্পের আওতায় অন্তর্ভুক্তির জন্য প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে বেহাল অবস্থায় পড়ে থাকা এই সড়কটি সংস্কার হলে কয়েকটি ইউনিয়নের মানুষের যাতায়াত সহজ হবে। তাই দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপের অপেক্ষায় রয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
তুলি আক্তার/ অনলাইন ডেস্ক / যোগফল.কম

আপনার মতামত লিখুন