পদ্মার পানি বাড়ার গতি কমলেও দুর্ভোগে অর্ধলাখ মানুষ
যোগফল প্রতিবেদক:
কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে পদ্মা নদীর পানি বাড়ার গতি কিছুটা কমেছে। তবে বন্যা পরিস্থিতির এখনো তেমন উন্নতি হয়নি। উপজেলার রামকৃষ্ণপুর ও চিলমারী ইউনিয়নের চরাঞ্চলের প্রায় ৪০টি গ্রামের ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। দুর্গত এলাকায় পর্যাপ্ত ত্রাণ না পৌঁছানোয় খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকটও বাড়ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, অনেক বাড়িঘরে পানি ঢুকে পড়েছে। পানিতে তলিয়ে গেছে রাস্তাঘাট ও ফসলের মাঠ। কোথাও কোথাও নৌকা ও ভেলাই হয়ে উঠেছে চলাচলের একমাত্র মাধ্যম। পানি ঢুকে পড়ায় চরাঞ্চলের ২৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও তিনটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শ্রেণি কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
পাবনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) হাইড্রোলজি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার সকাল ৯টায় হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পদ্মার পানির উচ্চতা ছিল ১৩ দশমিক ০৫ মিটার। ওই পয়েন্টে বিপৎসীমা ১৩ দশমিক ৮০ মিটার। এর আগের দিন শুক্রবার একই সময়ে পানির উচ্চতা ছিল ১৩ দশমিক ০২ মিটার। অর্থাৎ ২৪ ঘণ্টায় পানি বেড়েছে ৩ সেন্টিমিটার।
এর আগে এক সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১২ সেন্টিমিটার করে পানি বাড়ছিল। বর্তমানে পানি বৃদ্ধির হার কমলেও বন্যা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার মতো পানি এখনো কমেনি।
পাউবোর হাইড্রোলজি বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ইলিয়াস হোসেন বলেন, উজান থেকে নেমে আসা ঢল ও ভারী বৃষ্টির কারণে পদ্মায় দ্রুত পানি বেড়েছে। তবে গত ২৪ ঘণ্টায় পানি বৃদ্ধির হার কিছুটা কমেছে। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকবে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
পানি বাড়ার ফলে দৌলতপুরের রামকৃষ্ণপুর ও চিলমারী ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল এবং ফিলিপনগর ইউনিয়নের পদ্মার চরাঞ্চলের নিচু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় এসব এলাকার যোগাযোগব্যবস্থাও ভেঙে পড়েছে।
চিলমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল মান্নান জানান, ইউনিয়নের ১৯টি গ্রামের মধ্যে ১৭টির নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে প্রায় ৩০ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। তবে গত দুই-তিন দিনের তুলনায় শনিবার পানি বৃদ্ধির তীব্রতা কিছুটা কমেছে।
রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সিরাজ মণ্ডল বলেন, ইউনিয়নের ১৬টি গ্রামের চারপাশে পানি থইথই করছে। রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়ায় নৌকা ও ভেলাই এখন চলাচলের একমাত্র ভরসা। ইউনিয়নের ৩০ হাজারের বেশি মানুষ পানিবন্দী অবস্থায় রয়েছেন।
দৌলতপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রেহেনা পারভীন জানান, চিলমারী, রামকৃষ্ণপুর, ফিলিপনগর ও মরিচা ইউনিয়নের ৩৫১ হেক্টর আবাদি জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে মরিচ ও কলাচাষিরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। পানি আরও বাড়লে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও বাড়তে পারে।
এদিকে বন্যার পানি ঢুকে পড়ায় ২৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও তিনটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শ্রেণি কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। তবে এসব প্রতিষ্ঠানে দাপ্তরিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম চালু রয়েছে বলে জানিয়েছে উপজেলা শিক্ষা কার্যালয়।
দুর্গত এলাকায় রান্নার স্থান ও নলকূপ পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। গবাদিপশু নিয়েও বিপাকে পড়েছেন কৃষক ও খামারিরা। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বিষধর সাপের উপদ্রব।
রামকৃষ্ণপুরের এক বাসিন্দা বলেন, ঘরের ভেতরে কোমরসমান পানি। পরিবারের অন্যরা উঁচু জায়গায় গেলেও তিনি মাচা বেঁধে কোনোমতে অবস্থান করছেন।
আরেক বাসিন্দা জানান, রান্নাবান্না বন্ধ থাকায় পরিবারের সদস্যদের খাবার জোগাড় করতে কষ্ট হচ্ছে। তার পাঁচ বিঘা জমির মরিচ পানিতে তলিয়ে গেছে। চলাচলও কঠিন হয়ে পড়েছে। বয়স্করা ঘরবন্দী হয়ে আছেন এবং সাপের ভয়ও রয়েছে।
দুর্গত এলাকার বাসিন্দারা দ্রুত শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের পাশাপাশি জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে ভ্রাম্যমাণ মেডিকেল টিম পাঠানোর দাবি জানিয়েছেন।
দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তৌহিদুল হাসান তুহিন বলেন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনম মজুত রয়েছে। কাউকে সাপে কাটলে ওঝার কাছে গিয়ে সময় নষ্ট না করে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
সাদিয়া পারভিন / অনলাইন ডেস্ক / যোগফল.কম

আপনার মতামত লিখুন