সাংবাদিক বাবলুকে অপহরণ করে টাকা লুটের অভিযোগ
যোগফল প্রতিবেদক:
ফেসবুকে পরিচয়ের সূত্র ধরে রাজধানীর পোস্তগোলা থেকে এক সাংবাদিককে ডেকে নিয়ে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে অজ্ঞাত স্থানে আটকে রাখা এবং তার ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবা থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী সাংবাদিকের নাম কামরুজ্জামান বাবলু। তিনি দৈনিক এদিন পত্রিকার বিশেষ প্রতিনিধি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই শিক্ষার্থী নিউ নেশনসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে কাজ করেছেন।
এ ঘটনায় মঙ্গলবার ঢাকার সিএমএম আদালতে অপহরণের মামলা করেছেন কামরুজ্জামান বাবলু।
ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিসহ (ডিআরইউ) বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠন। তারা ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে।
মামলার অভিযোগ ও ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রায় দুই মাস আগে ফেসবুক মেসেঞ্জারে ‘মামুন শেখ’ নামে একটি আইডির সঙ্গে কামরুজ্জামান বাবলুর পরিচয় হয়। প্রথমে সাধারণ কথাবার্তা হলেও পরে ওই ব্যক্তি নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের উৎস হিসেবে পরিচয় দেন। সাংবাদিক পরিচয় জানার পর তিনি বিটকয়েনসহ বিভিন্ন বিষয়ে ‘চাঞ্চল্যকর তথ্য’ দেওয়ার কথা বলেন।
কামরুজ্জামান বাবলুর ভাষ্য, গত ৩০ সেপ্টেম্বর ঢাকায় আসার কথা জানিয়ে মামুন শেখ তাকে দেখা করার প্রস্তাব দেন। সাংবাদিক তাকে অফিসে আসতে বললেও মামুন জানান, তিনি জুরাইনে আত্মীয়ের বাসায় রয়েছেন। পরে জুরাইনে গিয়ে দেখা করার অনুরোধ করলে তিনি সেখানে যান।
অভিযোগ অনুযায়ী, দুপুর আড়াইটার দিকে পোস্তগোলা ব্রিজসংলগ্ন আলম মার্কেটের সামনে তাদের দেখা হয়। এ সময় মামুন তার বন্ধু ‘অনিক’ নামে একজনের সঙ্গে বাবলুকে পরিচয় করিয়ে দেন। পরে নিরিবিলি পরিবেশে কথা বলার কথা বলে তাকে একটি মাইক্রোবাসের কাছে নেওয়া হয়। প্রথমে গাড়িতে উঠতে রাজি না হলেও তাদের পীড়াপীড়িতে তিনি গাড়িতে ওঠেন।
বাবলুর অভিযোগ, গাড়ির ভেতরে আগে থেকেই আরও তিনজন ছিলেন। গাড়িতে ওঠার পর অস্ত্রের মুখে তাকে চুপ থাকতে বলা হয়। পরে তার হাত ও চোখ বেঁধে অজ্ঞাত স্থানের উদ্দেশে নিয়ে যাওয়া হয়।
তিনি জানান, প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টা গাড়িতে রাখার পর তাকে একটি গভীর জঙ্গলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে অস্ত্রধারী কয়েকজন ব্যক্তি পাহারা দিচ্ছিলেন। তাকে বিভিন্ন ধরনের হুমকি ও গালিগালাজ করা হয়।
মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, অপহরণকারীরা তাকে সরকারের বিরুদ্ধে এবং শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ফেসবুকে লেখালেখি করার অভিযোগে ভয়ভীতি দেখায়। একই সঙ্গে তার কাছে বিভিন্ন তথ্য চাওয়ার বিষয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করে। একপর্যায়ে তাকে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার কথা উল্লেখ করে ভয় দেখানো এবং হত্যার পর তার লাশের মাংস মাছকে খাওয়ানোর হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন বাবলু।
এ সময় তার মোবাইল ফোন, ব্যাংকের কার্ডসহ গুরুত্বপূর্ণ জিনিসপত্র নিয়ে নেওয়া হয় এবং বাইরের কারও সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ।
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, রাত ৯টার দিকে তার স্ত্রী ফোন করলে অপহরণকারীরা তাকে স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে বাধ্য করে। তবে কথাবার্তার মধ্যেই তার স্ত্রী পরিস্থিতি আঁচ করতে পারেন। পরে তিনি কামরুজ্জামানের বড় ভাইদের বিষয়টি জানান। স্বজনরা পল্টন থানায় গিয়ে বিষয়টি জানালে থানার এসআই তুষার দেবনাথ সাংবাদিকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন।
বাবলুর ভাষ্য, রাত সাড়ে ৯টা থেকে ১০টার দিকে পুলিশ তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও অপহরণকারীরা তাকে ফোন ধরতে দেয়নি। পরে রাত আড়াইটার দিকে তাদের উপস্থিতিতেই তিনি স্ত্রী ও পুলিশের ওই কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেন।
এ ঘটনায় নিজের ব্যাংক হিসাবের বিবরণী, বিকাশের লেনদেনের তথ্য, টাকা উত্তোলনের তথ্য, ব্যবহৃত মোবাইল নম্বর ও মোবাইল ফোনের আইএমইআই নম্বরসহ বিভিন্ন তথ্য আদালতে দাখিল করেছেন বলে জানান কামরুজ্জামান।
ঘটনার বিষয়ে সাংবাদিক কামরুজ্জামান বাবলু বলেন, ‘ফেসবুকে পরিচয়ের পর সাংবাদিক হিসেবে আমাকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেওয়ার কথা বলে ডেকে নেওয়া হয়েছিল। পরে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে চোখ ও হাত বেঁধে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আমাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয় এবং আমার ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে টাকা নেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত সুযোগ পেয়ে আমি পালিয়ে জীবন রক্ষা করি।’
পল্টন থানার এসআই তুষার দেবনাথ বলেন, অপহরণ, জিম্মি করে ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ জানাতে তিনি থানায় এসেছিলেন। তাকে নানা পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে এক বিবৃতিতে ডিআরইউ সভাপতি আবু সালেহ আকন ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তারা বলেন, একজন সাংবাদিককে পরিকল্পিতভাবে ফাঁদে ফেলে অপহরণ, অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে হত্যার হুমকি দেওয়া এবং অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ গুরুতর ও উদ্বেগজনক। তারা জড়িতদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
পৃথক বিবৃতিতে রিলিজিয়াস রিপোর্টার্স ফোরামের (আরআরএফ) সভাপতি ফয়েজ উল্লাহ ভূঁইয়া ও সাধারণ সম্পাদক খালিদ সাইফুল্লাহও প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তারা ব্যাংকিং লেনদেন, এটিএম বুথের সিসিটিভি ফুটেজ, এমএফএস অ্যাকাউন্ট, সংশ্লিষ্ট মোবাইল নম্বর ও আইএমইআই নম্বর আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে তদন্ত করে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার আহ্বান জানান।
তানজিলা / অনলাইন
ডেস্ক / যোগফল.কম

আপনার মতামত লিখুন