লক্ষ্মীপুরে নারকেলের ছোবড়ায় কোটি টাকার বাণিজ্য
যোগফল প্রতিবেদক:
একসময় নারকেলের ছোবড়া ফেলে দেওয়া হতো আবর্জনা হিসেবে। কেউ কেউ ব্যবহার করতেন রান্নার জ্বালানি হিসেবে। সময়ের সঙ্গে সেই অবহেলিত ছোবড়াই এখন পরিণত হয়েছে মূল্যবান সম্পদে। স্থানীয় উদ্যোক্তাদের হাত ধরে লক্ষ্মীপুরে গড়ে উঠেছে নারকেলের ছোবড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প। এ শিল্পকে ঘিরে জেলায় গড়ে উঠেছে ছোট-বড় প্রায় ৩০টি কারখানা। এসব কারখানায় ছোবড়া থেকে আঁশ ও গুঁড়া তৈরি করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে কর্মসংস্থান, বাড়ছে স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড।
লক্ষ্মীপুরের বিভিন্ন এলাকায় নারকেলের ছোবড়া থেকে উৎপাদিত আঁশ দিয়ে তৈরি হচ্ছে জাজিম, গদি, দড়ি, স্লিপার, খেলনা ও বিভিন্ন শৌখিন সামগ্রী। অন্যদিকে, আঁশ তৈরির সময় উপজাত হিসেবে পাওয়া গুঁড়া বা কোকোডাস্ট ব্যবহার করা হচ্ছে কৃষিকাজে। বিশেষ করে যেসব বাগানে মাটির ঘাটতি রয়েছে, সেখানে এই গুঁড়া কাজে লাগানো হচ্ছে।
জেলার রায়পুর উপজেলার হায়দরগঞ্জ, সদর উপজেলার দালাল বাজার, মান্দারী ও চন্দ্রগঞ্জ, রামগঞ্জ উপজেলার পানপাড়া, মীরগঞ্জ ও সোনাপুর, কমলনগর উপজেলার হাজিরহাট এবং রামগতি উপজেলার আলেকজান্ডার ও জমিদারহাট এলাকায় এসব কারখানা গড়ে উঠেছে। প্রতিটি কারখানায় নারী ও পুরুষ মিলিয়ে আট থেকে ১০ জন শ্রমিক কাজ করেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, লক্ষ্মীপুর জেলায় ২ হাজার ৬১০ হেক্টর জমিতে নারকেলের বাগান রয়েছে। এ ছাড়া জেলার প্রায় প্রতিটি বাড়ির আঙিনায় রয়েছে নারকেলগাছ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জেলায় ২৭ হাজার ১২০ মেট্রিক টন নারকেল উৎপাদিত হয়েছে, যার আনুমানিক বাজারমূল্য ৮১ কোটি টাকা। এ ছাড়া গত এক বছরে শুকনা নারকেল ও ডাব মিলিয়ে প্রায় ৪০০ কোটি টাকার আয় হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
সম্প্রতি লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার দালাল বাজারের একটি ছোবড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানায় গিয়ে দেখা যায়, কারখানার চত্বরে স্তূপ করে রাখা হয়েছে নারকেলের ছোবড়া। ডিজেলচালিত যন্ত্রের সাহায্যে ছোবড়া ছোট ছোট খণ্ড করা হচ্ছে। পরে নারী ও পুরুষ শ্রমিকেরা হাত দিয়ে সেসব খণ্ড থেকে আঁশ আলাদা করছেন। এরপর আঁশ রোদে শুকিয়ে প্লাস্টিকের সুতা দিয়ে বেঁধে তৈরি করা হচ্ছে গাঁট। স্থানীয়ভাবে এসব গাঁটকে ‘বেল’ বলা হয়। প্রতি বেলে থাকে ২০ কেজি আঁশ। অন্যদিকে, আঁশ ছাড়ানোর সময় পাওয়া গুঁড়া বস্তায় ভরে স্তূপ করে রাখা হচ্ছে। পরে আঁশ ও গুঁড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়।
কারখানার মালিক গাজী হাসমত জানান, প্রতিটি নারকেলের ছোবড়া দুই থেকে তিন টাকায় কেনা হয়। তাঁর কারখানা থেকে উৎপাদিত আঁশের ছয় থেকে সাত ট্রাক দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়। প্রতি ট্রাক আঁশের দাম ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকা। ছোবড়ার গুঁড়াও ভালো দামে বিক্রি হয়। স্থানীয় নারকেল ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ছোবড়া সংগ্রহ করে কারখানায় প্রক্রিয়াজাত করা হয়। এখানে আট থেকে ১০ জন শ্রমিক কাজ করেন।
স্থানীয় কয়েকজন শ্রমিক ও ব্যবসায়ী জানান, বিভিন্ন এলাকা থেকে নারকেল সংগ্রহের পর সেগুলো ছাড়িয়ে ছোবড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানায় আনা হয়। প্রতিটি কারখানা থেকে মাসে প্রায় তিন লাখ টাকার ছোবড়া বিক্রি হয় বলে তাঁরা জানান। এ শিল্পের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
জেলা বিসিক শিল্পনগরীর উপব্যবস্থাপক মো. ফজলুল করিম বলেন, লক্ষ্মীপুর নারকেল, সুপারি ও সয়াবিনের জন্য পরিচিত। তবে নারকেলের ছোবড়াও একটি সম্ভাবনাময় শিল্প। এ শিল্পের সঙ্গে প্রায় ৩০ জন উদ্যোক্তা জড়িত রয়েছেন। উদ্যোক্তারা বিসিকের সঙ্গে যোগাযোগ করলে ক্ষুদ্রঋণ সহায়তা, প্রশিক্ষণ ও শিল্প নিবন্ধনের সুযোগ পেতে পারেন। বিসিকের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখলে তাঁরা বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধাও পাবেন।
লক্ষ্মীপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক জহির আহমেদ বলেন, জেলায় নারকেলের আবাদ বাড়ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২৭ হাজার ১২০ মেট্রিক টন নারকেল উৎপাদিত হয়েছে, যার আনুমানিক বাজারমূল্য ৮১ কোটি টাকা। এ বছর প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় প্রায় ৪০ হাজার নারকেলের চারা বিতরণ করা হয়েছে। নারকেল ও ডাবের ভালো দাম পাওয়ায় কৃষকেরা এ ফসলের আবাদে আগ্রহী হচ্ছেন।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, আধুনিক প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ও সহজ অর্থায়নের ব্যবস্থা করা গেলে লক্ষ্মীপুরের নারকেলের ছোবড়াভিত্তিক শিল্প আরও সম্প্রসারিত হতে পারে। এতে অবহেলিত একটি কৃষিজ উপজাতের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
তানজিলা / অনলাইন
ডেস্ক / যোগফল.কম

আপনার মতামত লিখুন