বিচারাধীন জমি অর্পিত সম্পত্তির তালিকা থেকে অবমুক্ত নয়: হাইকোর্ট
যোগফল প্রতিবেদক:জমির মালিকানা নিয়ে একাধিক পক্ষের মধ্যে দেওয়ানি মামলা বিচারাধীন থাকলে বিরোধপূর্ণ ওই জমি অর্পিত সম্পত্তির তালিকা থেকে অবমুক্ত করা যাবে না বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। উপযুক্ত দেওয়ানি আদালতে জমির স্বত্ব চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হওয়ার পর রায়ে বিজয়ী পক্ষের অনুকূলে সম্পত্তিটি অবমুক্ত করা যাবে।
‘সাহাবুদ্দিন আহমেদ বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য’ মামলায় দেওয়া রায়ে এ নির্দেশনা দিয়েছেন হাইকোর্ট। জমির মালিকানা নিয়ে দায়ের করা পৃথক দুটি রিট আবেদন নিষ্পত্তি করে বিচারপতি ফাতেমা নজীব ও বিচারপতি এ এফ এম সাইফুল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ গত ১৯ মে এ রায় দেন। সম্প্রতি ২২ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়টি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। রায়ের মূল অংশ লেখেন বিচারপতি এ এফ এম সাইফুল করিম।
রায়ে আদালত বলেন, বিরোধপূর্ণ সম্পত্তির মালিকানা ও স্বত্বের প্রশ্ন উপযুক্ত দেওয়ানি আদালতে নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন। এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত কোনো পক্ষের অনুকূলে সম্পত্তিটি অর্পিত সম্পত্তির তালিকা থেকে অবমুক্ত করা সমীচীন হবে না।
যেভাবে বিরোধের সূত্রপাত
প্রকাশিত রায়ের বিবরণ অনুযায়ী, ফরিদপুর জেলার ৭ দশমিক ২৩ শতাংশ জমি নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত। জমিটির মূল মালিক ছিলেন যমুনা চামার ও গয়ানাত চামার। পরবর্তী সময়ে হস্তান্তরের ধারাবাহিকতায় জমিটির মালিকানা অনিল কুমার দত্তের কাছে যায়। পরে দানসূত্রে তাঁর ছেলে অলোক কুমার দত্ত জমিটির মালিক হন।
অলোক কুমার দত্ত ১৯৯৬ সালের ৮ জুলাই রেজিস্ট্রিকৃত বিক্রয় দলিলের মাধ্যমে জমিটি শাহাবুদ্দিন আহমেদের কাছে বিক্রি করেন এবং তাঁকে দখল বুঝিয়ে দেন।
অন্যদিকে, মামলার অন্যতম বিবাদী মো. জাহিদুর রহমানের দাবি, অলোক কুমার দত্ত ১৯৯৬ সালের ২৩ মে তাঁর সঙ্গে জমিটি বিক্রির জন্য একটি বায়নাপত্র সম্পাদন করেছিলেন। চুক্তি বাস্তবায়নের দাবিতে তিনি ২০০১ সালে দেওয়ানি মামলা করেন। ওই মামলায় ২০০১ সালের ২৮ অক্টোবর একতরফা ডিক্রি পান এবং ২০০৩ সালে আদালতের মাধ্যমে রেজিস্ট্রিকৃত দলিলের অধিকারী হন।
এদিকে, ওই রায় ও ডিক্রির বিরুদ্ধে ২০২১ সালের ২৫ আগস্ট ফরিদপুরের জেলা জজ আদালতে টাইটেল আপিল করেন শাহাবুদ্দিন আহমেদ। পরে বিলম্ব মার্জনা করে আপিলটি শুনানির জন্য গ্রহণ করা হয়। এ আদেশের বিরুদ্ধে জাহিদুর রহমান দেওয়ানি কার্যবিধির ১১৫(১) ধারায় হাইকোর্টে সিভিল রিভিশন দায়ের করেন।
শুনানি শেষে হাইকোর্ট সংশ্লিষ্ট রুল যথাযথ ঘোষণা করে আগের আদেশ বাতিল করেন এবং আপিল গ্রহণের বিষয়ে নতুন করে শুনানি করতে ফরিদপুরের জেলা জজকে নির্দেশ দেন। সেই নির্দেশনা অনুসারে, ২০২৩ সালের ২৫ মে জেলা জজ আদালত আপিলটি গ্রহণ করেন।
এরপর ওই আদেশের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালে আবারও হাইকোর্টে সিভিল রিভিশন করেন জাহিদুর রহমান। একই বছরের ২৫ ফেব্রুয়ারি আদালত রুল জারির পাশাপাশি অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ দেন। ওই সিভিল রিভিশন এখনো হাইকোর্ট বিভাগে বিচারাধীন।
দুই পক্ষের বক্তব্য
শুনানিতে শাহাবুদ্দিন আহমেদের আইনজীবী জাকির হোসেন ভূঁইয়া বলেন, ১৯৯৬ সালে রেজিস্ট্রিকৃত দলিলের মাধ্যমে জমির মালিকানা অর্জনের পর থেকে তাঁর মক্কেল জমিটি ভোগদখল করে আসছেন। ২০০১ সালের চুক্তি বাস্তবায়নের মামলায় শাহাবুদ্দিন আহমেদকে পক্ষভুক্ত করা হয়নি বলে ওই মামলার ডিক্রি ও পরবর্তী দলিলের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
অন্যদিকে, জাহিদুর রহমানের আইনজীবী মো. নাসির শিকদার দাবি করেন, তাঁর মক্কেলের বায়নাপত্রটি শাহাবুদ্দিন আহমেদের বিক্রয় দলিলের আগের। আদালতের ডিক্রির মাধ্যমে অর্জিত স্বত্ব ও দলিলের ভিত্তিতে তাঁর মক্কেল আইনি অধিকার পেয়েছেন বলেও যুক্তি দেন তিনি।
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনা
হাইকোর্ট পর্যবেক্ষণে বলেন, জমিটির মালিকানা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে চলমান দেওয়ানি বিরোধের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি। পাশাপাশি শাহাবুদ্দিন আহমেদের ক্রয় করা জমির দলিলের সত্যতা ও বৈধতা নিয়েও জটিলতা রয়েছে। এসব বিষয় সংক্ষিপ্ত রিট শুনানিতে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
আদালত আরও বলেন, বিরোধপূর্ণ সম্পত্তির মালিকানা ও স্বত্ব আগে উপযুক্ত দেওয়ানি আদালতের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে। এরপর যে পক্ষের অনুকূলে স্বত্ব চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হবে, সেই পক্ষের অনুকূলে সম্পত্তিটি অর্পিত সম্পত্তির তালিকা থেকে অবমুক্ত করা যাবে।
এ নির্দেশনা বাস্তবায়নে ফরিদপুরের জেলা প্রশাসককে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে মালিকানা নিয়ে উচ্চ আদালতে বিচারাধীন আইনি লড়াই নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে বিরোধপূর্ণ সম্পত্তির দখলের বিষয়ে স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।
রায়ের মাধ্যমে আদালত স্পষ্ট করেছেন, জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ বিচারাধীন থাকলে কেবল রিটের মাধ্যমে সেই বিরোধের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করা যাবে না। আগে উপযুক্ত দেওয়ানি আদালতে স্বত্ব নির্ধারণ করতে হবে।
তানজিলা / অনলাইন
ডেস্ক / যোগফল.কম

আপনার মতামত লিখুন