লালন সাঁইয়ের ১৩৬তম তিরোধান দিবস আজ, মানবতাবাদী দর্শনে আজও প্রাসঙ্গিক
ছবি সংগৃহীত
নিজস্ব প্রতিবেদক:
জাতপাত, ধর্ম ও বর্ণের বিভেদ পেরিয়ে মানুষকে বড় করে দেখার যে দর্শন, তা গানে গানে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন বাউলসম্রাট ফকির লালন সাঁই। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই তাঁর গানে উঠে এসেছে জীবন, আত্মোপলব্ধি ও মানবতার গভীর দর্শন। সেই মরমি সাধকের ১৩৬তম তিরোধান দিবস আজ শনিবার (১৭ অক্টোবর)।
ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাংলার বাউলসংগীত ও সাধনধারার অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব ছিলেন লালন সাঁই। তাঁর গানে ধর্মীয় পরিচয়, জাতপাত ও সামাজিক বিভেদের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষকে জানার আহ্বান রয়েছে। ‘সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে’ এবং ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়’—এমন গান আজও শ্রোতাদের ভাবায়, জাগিয়ে তোলে আত্মঅনুসন্ধানের আকাঙ্ক্ষা।
লালনের দর্শনের কেন্দ্রে ছিল ‘মনের মানুষ’কে খুঁজে পাওয়ার সাধনা। মানুষের মধ্যেই পরম সত্তার সন্ধান এবং মানবপ্রেমের মধ্য দিয়ে আত্মিক উপলব্ধি অর্জনের ভাবনা তাঁর গানে বিশেষভাবে প্রকাশ পেয়েছে। এ কারণেই তাঁর গান শুধু সংগীত হিসেবে নয়, জীবনদর্শনের অনন্য প্রকাশ হিসেবেও বিবেচিত।
রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য ও দর্শনে লালনের প্রভাব
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্য ও চিন্তাজগতে বাংলার বাউলসংগীতের প্রভাব ছিল উল্লেখযোগ্য। জমিদারি দেখাশোনার কাজে শিলাইদহে অবস্থানকালে তিনি বাংলার বাউলদের গান ও দর্শনের সঙ্গে পরিচিত হন। বাউলদের সহজ-সরল ভাষায় প্রকাশিত গভীর আধ্যাত্মিকতা ও মানবতাবাদী চিন্তা তাঁকে আকৃষ্ট করেছিল।
রবীন্দ্রনাথ লালনের গান সংগ্রহ ও প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাঁর উদ্যোগে লালনের বেশ কিছু গান সংকলিত হয় এবং কলকাতার মাসিক ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। গবেষকদের মতে, লালনের গান শিক্ষিত সমাজের কাছে পরিচিত করে তোলার ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের এ উদ্যোগ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শান্তিনিকেতনেও বাউলসংগীতের চর্চা ও প্রচারে তিনি ভূমিকা রাখেন।
বাউলদের ‘মনের মানুষ’ ধারণা রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদী চিন্তার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। মানুষের অন্তর্জগৎ, আত্মিক মুক্তি ও মানবপ্রেমের মতো বিষয় তাঁর বিভিন্ন সাহিত্যকর্মে প্রতিফলিত হয়েছে। লালন ও বাংলার বাউলধারার প্রভাব রবীন্দ্রনাথের ভাবজগৎকে সমৃদ্ধ করেছে বলে মনে করেন গবেষকেরা।
সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে লালনের দর্শন
লালন সাঁইয়ের গানের বড় শক্তি হলো, তিনি জটিল জীবনদর্শনকে সহজ ভাষা ও সুরের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। তাঁর গান মানুষকে নিজের পরিচয়, বিশ্বাস, সমাজের বিভাজন এবং জীবনের অর্থ নিয়ে নতুন করে ভাবতে শেখায়।
বর্তমান সময়েও ধর্মীয় সহনশীলতা, মানবিক মূল্যবোধ ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির আলোচনায় লালনের দর্শন প্রাসঙ্গিক। তাঁর গান মনে করিয়ে দেয়, মানুষের প্রকৃত পরিচয় কোনো বাহ্যিক বিভাজনে নয়; বরং মানবিকতা, ভালোবাসা ও আত্মোপলব্ধির মধ্যেই নিহিত।
মরমি সাধক লালন সাঁইয়ের জীবন ও দর্শন তাই শুধু বাংলার লোকসংস্কৃতির সম্পদ নয়, মানবতার এক অনন্য উত্তরাধিকার।
তথ্যসূত্র: আবুল আহসান চৌধুরীর ‘রবীন্দ্রনাথ ও লালন’, উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের ‘বাংলার বাউল ও বাউল গান’ এবং লালনের গান নিয়ে প্রকাশিত গবেষণাকর্ম।
তুলি আক্তার/ অনলাইন ডেস্ক / যোগফল.কম

আপনার মতামত লিখুন