চট্টগ্রাম বন্দরে কোটি টাকার শুল্ক ফাঁকির চেষ্টা, ৮ ঘটনায় কঠোর আইনি ব্যবস্থা
যোগফল প্রতিবেদক:
কম শুল্কের পণ্য আমদানির ঘোষণা দিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে কোটি কোটি টাকার উচ্চ শুল্কের পণ্য আনার অভিযোগে বড় ধরনের জালিয়াতির ঘটনা উদ্ঘাটন করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি) ও চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউস। আটটি ঘটনায় আমদানিকারক ও সংশ্লিষ্ট ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়ার্ডিং (সিঅ্যান্ডএফ) এজেন্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হয়েছে।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) এনবিআরের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, চীন, পাকিস্তান ও থাইল্যান্ড থেকে কম শুল্কের পণ্যের ঘোষণা দিয়ে আমদানি করা চালানে পাওয়া গেছে নামী ব্র্যান্ডের প্রসাধনী, ফেস মাস্ক, অ্যান্টি-এজিং জেল, বিএসটিআই নিষিদ্ধ ক্রিম, লেজার লাইট, গাড়ির দামি ইঞ্জিনের যন্ত্রাংশ, বিয়ারিং, নাট-বল্টুসহ বিভিন্ন উচ্চ শুল্কের পণ্য। এ ছাড়া কাস্টমসের লক করা কন্টেইনারের মূল সিল ভেঙে ভিন্ন সিল লাগিয়ে সরিয়ে নেওয়ার অপচেষ্টার তথ্যও পাওয়া গেছে।
এনবিআর জানায়, সিআইসি ও চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের অডিট, ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড রিসার্চ (এআইআর) শাখার যৌথ অভিযানে এসব জালিয়াতি উদ্ঘাটিত হয়। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কাস্টমস আইন, ২০২৩-এর ৩৩ ও ১৭১ ধারায় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
পাওয়ার স্প্রেয়ারের নামে প্রসাধনী ও স্টেজ লাইট
ঢাকার নিউ মার্কেটের আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ফরচুন গ্লোবাল ট্রেডিং চীন থেকে ১১ হাজার ৯৫৬ কেজি পাওয়ার স্প্রেয়ার মেশিন আমদানির ঘোষণা দেয়। তবে কায়িক পরীক্ষায় মেশিনের পরিবর্তে স্টেজ লাইট, ফেস ক্রিম, সান ক্রিম, টুথপেস্ট, পিলিং জেল, সিরাম, এলইডি লাইট, সানগ্লাস ও ব্ল্যাক হেয়ার শ্যাম্পু পাওয়া যায়।
ঘোষিত ওজনের চেয়ে প্রায় ১ হাজার ৮১৭ কেজি পণ্য বেশি পাওয়া যায়। এসব পণ্য ঘোষণা ছাড়াই আমদানি করে আনুমানিক আড়াই কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির চেষ্টা করা হয়েছিল বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।
টুথপিকের চালানে নিষিদ্ধ ক্রিম ও ডিলে স্প্রে
পুরান ঢাকার চকবাজারের কাফ করপোরেশন চীন থেকে সাড়ে ২২ টন টুথপিক আমদানির ঘোষণা দেয়। কিন্তু পরীক্ষায় টুথপিক পাওয়া যায় মাত্র ১ হাজার ৬২০ কেজি। বাকি পণ্যের মধ্যে ছিল পাকিস্তানের বিএসটিআই নিষিদ্ধ গোরি বিউটি ক্রিম, ফেস ক্রিম, সান ক্রিম, অ্যান্টি-এজিং জেল, হেয়ার রিমুভার স্প্রে, সানগ্লাস ও যৌন উত্তেজক ডিলে স্প্রে।
এ চালানে আনুমানিক ২ কোটি ৮০ লাখ টাকার রাজস্ব ফাঁকির চেষ্টা করা হয়েছে বলে জানায় এনবিআর।
রবার বুশের আড়ালে দামি গাড়ির যন্ত্রাংশ
ঢাকার এইচ আর এন্টারপ্রাইজ থাইল্যান্ড থেকে ১৬ হাজার ৪০ কেজি ইঞ্জিন রবার বুশ আমদানির ঘোষণা দেয়। কিন্তু কায়িক পরীক্ষায় প্রকৃত রবার বুশ পাওয়া যায় মাত্র ৬ হাজার ৬২৫ কেজি। বাকি পণ্যের মধ্যে ছিল ইঞ্জিন মাউন্টিং, সাসপেনশন বুশ, আর্ম বুশ, সেন্টার বিয়ারিং, স্প্রিং শ্যাকল ও স্টিয়ারিংয়ের মতো দামি মোটরযান যন্ত্রাংশ।
এ ঘটনায় আনুমানিক ৪৪ লাখ টাকার রাজস্ব ফাঁকির তথ্য পাওয়া গেছে। একই প্রতিষ্ঠানের আরেকটি চালানে কমিশনারের পূর্বানুমতি ছাড়া এইচএস কোড পরিবর্তনের আবেদনের মাধ্যমে অনিয়মের চেষ্টা নস্যাৎ করা হয়েছে।
ট্রান্সফার পেপারের আড়ালে ২১ টন ফ্লেক্স ব্যানার
নিউ ট্রাস্ট ট্রেডার্স চীন থেকে ২৩ হাজার ৬১৮ কেজি হিট ট্রান্সফার পেপার আমদানির ঘোষণা দেয়। কিন্তু পরীক্ষায় মাত্র ৩ হাজার ১৬০ কেজি পেপার পাওয়া যায়। বাকি প্রায় ২১ হাজার ৪৬৭ কেজি পণ্য ছিল ঘোষণা-বহির্ভূত পিভিসি ফ্লেক্স ব্যানার।
এ চালানে আনুমানিক ৪০ লাখ টাকার রাজস্ব ফাঁকির চেষ্টা করা হয়েছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।
স্টেইনলেস স্টিলের নামে নাট-বল্টু ও বিয়ারিং
বংশালের নিউ রনি এন্টারপ্রাইজ এবং ওয়ারীর মোহাম্মাদীয়া ট্রেড নামের দুটি প্রতিষ্ঠানের চালানেও অনিয়ম ধরা পড়ে।
মোহাম্মাদীয়া ট্রেড ২২ টন স্টেইনলেস স্টিল সার্কেল ও এক্সকাভেটর গিয়ার আমদানির ঘোষণা দিলেও বাস্তবে পাওয়া যায় মাত্র ৩ দশমিক ৮ টন ঘোষিত পণ্য। কন্টেইনারে আরও পাওয়া যায় ২২ হাজার ১১৩ কেজি নাট, বল্টু ও স্ক্রু। এ ঘটনায় আনুমানিক ৩২ লাখ টাকার রাজস্ব ফাঁকির চেষ্টা করা হয়।
অন্যদিকে, নিউ রনি এন্টারপ্রাইজের চালানে ১৭ হাজার ৫৯২ কেজি নাট-বল্টু, ২ হাজার ৭৮৭ কেজি ভারী রোলিং বিয়ারিং এবং ২ হাজার ৩৩৬ কেজি রিভলভিং চেয়ারের গ্যাস লিফট সিলিন্ডার পাওয়া যায়। এ ঘটনায় রাজস্ব ফাঁকির পরিমাণ আনুমানিক ৪২ লাখ টাকা।
কাস্টমসের লক ভেঙে সিল পরিবর্তনের চেষ্টা
কাফ করপোরেশনের আরেকটি চালানে কাস্টমসের নিরাপত্তাব্যবস্থা ফাঁকি দিয়ে কন্টেইনার সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা ধরা পড়ে। কন্টেইনারটি ইয়েলো লেনভুক্ত ছিল এবং শুল্ক ফাঁকির সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়ার পর সিআইসি ও এআইআর শাখা সেটি লক করে।
এনবিআরের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, কায়িক পরীক্ষার নির্ধারিত তারিখের আগে ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ কন্টেইনারটি অবৈধভাবে নামিয়ে মূল সিল ভেঙে অন্য সিল লাগানো হয়। নথিপত্র যাচাইয়ে বদলি হওয়া কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর জাল করার অভিযোগও পাওয়া যায়। বিষয়টি শনাক্ত হওয়ার পর কন্টেইনারটি কঠোর নিরাপত্তা হেফাজতে নিয়ে জব্দ করা হয়েছে।
জালিয়াতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে কাস্টমস
এনবিআর জানায়, সিআইসি ও কাস্টমসের ডিজিটাল রিস্ক ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থার নজরদারির মাধ্যমে এসব অনিয়ম শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। বিশেষ করে লক করা কন্টেইনারের সিল পরিবর্তনের ঘটনা একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সক্রিয়তার ইঙ্গিত দেয়।
দেশীয় শিল্প সুরক্ষা ও রাষ্ট্রীয় রাজস্ব নিশ্চিত করতে জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত আমদানিকারক এবং সংশ্লিষ্ট সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
তানজিলা / অনলাইন
ডেস্ক / যোগফল.কম

আপনার মতামত লিখুন