পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনে রাজনৈতিক ইন্ধনের অভিযোগ পুলিশের
ছবি সংগৃহীত
নিজস্ব প্রতিবেদক:
পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণসহ বিভিন্ন দাবিতে চলমান আন্দোলন ও সহিংসতায় রাজনৈতিক ইন্ধন রয়েছে বলে মনে করছে পুলিশ। সরকারের পক্ষ থেকে শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দেওয়ার পরও ঢাকা, গাজীপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকদের বিক্ষোভ, সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় পুলিশের স্থাপনা, যানবাহন ও পোশাক কারখানা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পুলিশের সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলো জানিয়েছে, কয়েক দিন ধরেই শ্রমিক আন্দোলনের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছিল। শ্রমিকদের দাবি বিবেচনায় সরকার নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্ত নিলেও একটি পক্ষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানি দিয়ে শ্রমিকদের মাঠে নামিয়েছে বলে তাদের দাবি। কোনো কোনো এলাকায় চক্রান্তকারীরা নিজেরাও আন্দোলনে অংশ নিয়ে পরিস্থিতি সহিংসতার দিকে ঠেলে দিয়েছে বলে অভিযোগ পুলিশের।
শিল্প পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি গাজী জসীম উদ্দিন বলেন, এই আন্দোলনে রাজনৈতিক ইন্ধন রয়েছে। বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করে শ্রমিকদের উসকানি দেওয়া হয়েছে। শ্রমিক সেজে অনেকে আন্দোলনেও অংশ নিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘আমরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু আইডি শনাক্ত করেছি। যাদের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা আছে। তারা শ্রমিকদের ব্যবহার করে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা করে চলেছে।’
রোববার দুপুরে ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম প্রিভেনশন উত্তর) মো. মহিদুল ইসলাম দাবি করেন, আন্দোলনকারীদের মধ্যে কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠনের সদস্যরা ঢুকে পড়েছেন।
এদিকে ডিবির মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার মোহাম্মদ রাকিব খান বলেন, আটক ব্যক্তিদের মধ্যে বিভিন্ন জেলা থেকে আসা আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী রয়েছেন। তাঁর দাবি, মিরপুরের সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লার ভাগনে আলিফ মোল্লা শতাধিক ব্যক্তিকে সংগঠিত করে শ্রমিক আন্দোলনে পাঠিয়েছিলেন। তাঁরাই পুলিশের গাড়িতে আগুন ও ভাঙচুর চালিয়েছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
গত শুক্র ও শনিবার শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক এবং মজুরি বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্ত হলেও রোববার সকাল থেকে রাজধানী ঢাকা ও গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে সড়কে নামেন শ্রমিকরা। সড়ক অবরোধ, অগ্নিসংযোগ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ার গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে। এর মধ্যেই পূর্বঘোষণা অনুযায়ী শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় পোশাকশ্রমিকদের জন্য নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করে। পরিস্থিতি বিবেচনায় শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী তাঁর সংযুক্ত আরব আমিরাত সফর বাতিল করেন।
শ্রমিক অসন্তোষ মোকাবিলায় করণীয় নির্ধারণ করতে রোববার সন্ধ্যায় কয়েকজন মন্ত্রী ও উপদেষ্টাকে নিজের কার্যালয়ে ডেকে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
পোশাক খাত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির জন্য প্রথমে মজুরি বোর্ড গঠন জরুরি। এরপর শ্রমিক ও মালিকপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে নতুন মজুরি নির্ধারণ করা হবে। শ্রমিকদের আশঙ্কা ছিল, দ্রুত মজুরি বোর্ড গঠন না হলে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। এ কারণে তাঁরা মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে আসছিলেন।
এর আগে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে পোশাক খাতে নিম্নতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা ঘোষণা করা হয়, যা পরের মাস থেকে কার্যকর হয়। প্রতি পাঁচ বছর পরপর মজুরি বোর্ড গঠনের বিধান থাকলেও গত ১০ এপ্রিল জাতীয় সংসদে পাস হওয়া শ্রম আইন সংশোধনীতে মজুরি পুনর্নির্ধারণের সময় পাঁচ বছর থেকে কমিয়ে তিন বছর করা হয়। সে হিসাবে নভেম্বর মাসে নতুন নিম্নতম মজুরি বোর্ড ঘোষণার কথা।
গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়নের সহকারী সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুর মঈন বলেন, শ্রমিকদের দাবির মুখে সরকার মজুরি বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্ত নিলেও বিষয়টি যথাযথভাবে প্রচার হয়নি। শ্রমমন্ত্রীর সঙ্গে শুক্র ও শনিবার দফায় দফায় বৈঠক হয়েছে। সংবাদ সম্মেলন করেও মজুরি বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছিল। তবে অনেক শ্রমিকের কাছে সেই তথ্য পৌঁছায়নি। ফলে সরকারের অবস্থান না বুঝেই অনেক জায়গায় শ্রমিকরা আন্দোলনে নেমেছেন।
মিরপুরে সংঘর্ষ, পুলিশের গাড়িতে আগুন
রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বর এলাকায় রোববার পুলিশের সঙ্গে তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিকদের সংঘর্ষ হয়। বেলা সোয়া ১১টার দিকে শুরু হওয়া সংঘর্ষ পরে মিরপুরের বিভিন্ন সড়কে ছড়িয়ে পড়ে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শ্রমিকরা সড়ক অবরোধ করলে পুলিশ তাঁদের সরে যাওয়ার অনুরোধ করে। একপর্যায়ে শ্রমিকরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করলে সংঘর্ষ শুরু হয়। পুলিশ লাঠিপেটা করে। আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে জলকামান, সাউন্ড গ্রেনেড ও কাঁদানে গ্যাসের শেল ব্যবহার করা হয়।
শ্রমিকরা কয়েকবার ছত্রভঙ্গ হলেও আবার সংগঠিত হয়ে পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। দুপুর ১২টা পর্যন্ত চলে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া। সংঘর্ষের মধ্যে দুপুর ১২টার দিকে পূরবী সিনেমা হলের সামনের সড়কে পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জালাল উদ্দিন জানান, আন্দোলনকারীদের দেওয়া আগুনে পুলিশের একটি গাড়ি পুড়ে গেছে।
এ ঘটনায় ভাঙচুর ও সংঘর্ষে জড়িত থাকার অভিযোগে মিরপুরের বিভিন্ন এলাকা থেকে ২৯ জনকে আটক করেছে পুলিশ।
সাত ঘণ্টা অবরোধে অচল ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক
রোববার সকাল থেকে পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভ, মহাসড়ক অবরোধ, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় কার্যত অচল হয়ে পড়ে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে শুরু হওয়া আন্দোলন চলে বিকেল ৩টা পর্যন্ত। প্রায় সাত ঘণ্টা অবরোধের পর শ্রমিকরা মহাসড়ক ছেড়ে দিলে যান চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করে।
দিনভর আন্দোলনকে কেন্দ্র করে গাজীপুরের কোনাবাড়ী, কালিয়াকৈর, চন্দ্রা, পল্লী বিদ্যুৎ, সফিপুর, মৌচাক, রতনপুর ও কাশিমপুরসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের হামলা ও অগ্নিসংযোগে কোনাবাড়ী ফ্লাইওভারের নিচে থাকা ট্রাফিক পুলিশ বক্স, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি গাড়ি, কালিয়াকৈরের চন্দ্রা পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় একটি পিকআপ ভ্যান এবং ট্রপিক্যাল পোশাক কারখানার ঝুটের গোডাউন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ছাড়া যমুনা ব্যাংক, কয়েকটি কারখানার ফটক এবং মৌচাক এলাকার একটি পুলিশ বক্স ভাঙচুর করা হয়। আন্দোলনের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে কয়েকজন সংবাদকর্মীও শ্রমিকদের মারধরের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গাজীপুরের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল ও মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে বিজিবির পাঁচ প্লাটুন সদস্য মোতায়েন করা হয়। পাশাপাশি পুলিশ, শিল্প পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সতর্ক অবস্থানে রাখা হয়।
শ্রমিক আন্দোলনের মুখে কালিয়াকৈরসহ গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে অন্তত ৩০টি পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ।
পুলিশ, শ্রমিক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দুই সপ্তাহ ধরে কোনাবাড়ী, মৌচাক, সফিপুর ও কালিয়াকৈরের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে বেতন বৃদ্ধির দাবিতে অসন্তোষ চলছে। শ্রমিকদের দাবি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে বর্তমান বেতনে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। বাসাভাড়া, খাবার, চিকিৎসা ও সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ মেটাতে তাঁদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। তাই ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবি জানিয়ে আসছেন তাঁরা।
আশুলিয়ায় ১৭৭ কারখানায় ছুটি
শ্রমিকদের বিক্ষোভের মধ্যে আশুলিয়ায় ১৭৭টি পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। শ্রমিক অসন্তোষের আশঙ্কায় শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থান ও কারখানার সামনে পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
রোববার সকালে অধিকাংশ কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিক থাকলেও পাঁচটি কারখানার শ্রমিকরা কাজ বন্ধ রেখে ভেতরে অবস্থান করেন। পরে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কয়েকটি কারখানার শ্রমিক সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। এতে নরসিংহপুরসহ আশপাশের শিল্পাঞ্চলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া সন্ধ্যায় জানান, সাভার ও আশুলিয়ায় দিনের বিভিন্ন সময়ে ১৭৭টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ।
শিল্পাঞ্চলের সার্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বিভিন্ন স্থানে অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
হেমায়েতপুরে কারখানায় হামলা-ভাঙচুর
ঢাকার সাভারের হেমায়েতপুরে একেএইচ গ্রুপের একটি কারখানায় হামলা ও ভাঙচুর চালিয়ে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করেন পোশাকশ্রমিকরা। এ সময় কারখানার কাচ ও বেশ কয়েকটি গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করায় মহাসড়কের উভয় পাশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
রোববার দুপুর আড়াইটার দিকে এ ঘটনা ঘটে। তথ্য সংগ্রহ ও ভিডিও ধারণ করতে গিয়ে বিক্ষোভকারীদের মারধরের শিকার হন স্থানীয় এক সাংবাদিক। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে শ্রমিকদের বুঝিয়ে সড়ক থেকে সরিয়ে দিলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
তুলি আক্তার/ অনলাইন ডেস্ক / যোগফল.কম

আপনার মতামত লিখুন