মামুনুল হকের তিন মুরুব্বিকে ওলীপুরীর ছয় পৃষ্ঠার চিঠি, কওমি অঙ্গনে বিতর্ক
ছবির ক্যাপশন
নিজস্ব প্রতিবেদক:
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের (বিকেএম) আমির মাওলানা মামুনুল হকের সাম্প্রতিক বক্তব্য ও রাজনৈতিক অবস্থান ঘিরে কওমি অঙ্গনে মওদুদী ও সালাফি মতাদর্শের প্রভাব নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ‘আকিদা, দেওবন্দিয়ত ও কওমি ঐতিহ্যের সুরক্ষায়’ মামুনুল হকের তিন মুরুব্বির কাছে ছয় পৃষ্ঠার একটি লিখিত চিঠি পাঠিয়েছেন হবিগঞ্জের মাদ্রাসা নূরে মদিনার পরিচালক ও আলেম মাওলানা নুরুল ইসলাম ওলীপুরী।
সম্প্রতি সিলেটের ঐতিহ্যবাহী আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে খাদিমুল কোরআন পরিষদের তাফসির মাহফিলে মামুনুল হককে অতিথি করার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে স্থানীয় আলেমদের একাংশ অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তাদের অভিযোগ, মামুনুল হক জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে রাজনৈতিক অবস্থান বজায় রেখেও কওমি সমাজের প্রতিনিধিত্বের দাবি করায় বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে।
এ নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতপার্থক্য প্রকাশ্যে আসার পর ওলীপুরীর চিঠির বিষয়টি কওমি অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সকালে চিঠি পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে নিজেদের অবস্থান জানিয়েছেন মামুনুল হকের তিন মুরুব্বি।
চিঠিতে বলা হয়েছে, এর আগে এক বক্তব্যে মামুনুল হক জানিয়েছিলেন, তার কোনো বক্তব্য বা কর্মকাণ্ড নিয়ে কারও আপত্তি থাকলে তা যেন তার তিন মুরুব্বির কাছে উপস্থাপন করা হয়। তাদের সিদ্ধান্ত তিনি মেনে চলবেন বলেও জানিয়েছিলেন। সেই নির্দেশনা অনুসারে মিরপুরের মাদ্রাসা দারুর রাশাদের শিক্ষাসচিব মাওলানা লিয়াকত আলী, গাজীপুরের অধ্যক্ষ শাহ মুহাম্মদ মিজানুর রহমান চৌধুরী (দেওনার পীর) এবং বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুল হকের কাছে চিঠিটি পাঠান ওলীপুরী।
চিঠির বিষয়ে মাওলানা লিয়াকত আলী জানান, চিঠি পাওয়ার সময় তিনি অসুস্থ ছিলেন এবং কিছুটা ব্যস্ততাও ছিল। তিনজন একসঙ্গে বসে পরামর্শ করে জবাব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘চিঠিটি তো মূলত তিনজনকে দেওয়া হয়েছে। তাই আমরা চেয়েছিলাম তিনজন একসঙ্গে বসে পরামর্শ করে জবাবটা দেব। এখন আমরা তিনজন বসে পরামর্শ করে জবাবটা দেব ইনশাআল্লাহ।’
অন্যদিকে মাওলানা মাহফুজুল হক লিখিত জবাবের পরিবর্তে সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেন, চিঠিতে উত্থাপিত বিষয়গুলো লিখিত জবাব দেওয়ার মতো নয়; বরং সামনাসামনি আলোচনার বিষয়।
তিনি বলেন, ‘আমরা চিঠি পেয়েছি, তবে চিঠির বিষয়গুলো এমন যে, এটা লিখিত জবাব দেওয়ার মতো কিছু না। এটা হলো সাক্ষাতে কথা বলার মতো বিষয়। ওলীপুরী সাহেব তো ওইরকমভাবে সাক্ষাতে কথা বলার মতো কোনো উদ্যোগ নেননি। আমরা মনে করি এখানে মাওলানা মামুনুল হকসহ সবাই বসে কথা বলা দরকার। তো কোনো সময় সরাসরি সাক্ষাতে বসার উদ্যোগ নিলে ইনশাআল্লাহ আমরা কথা বলব।’
তৃতীয় মুরুব্বি অধ্যক্ষ শাহ মুহাম্মদ মিজানুর রহমান চৌধুরীও চিঠি পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে বাইরে অবস্থান করায় পরে বিস্তারিত মতামত জানাবেন বলে জানান তিনি।
চিঠিতে ওলীপুরীর পাঁচটি প্রধান আপত্তি
দীর্ঘ চিঠিতে মাওলানা নুরুল ইসলাম ওলীপুরী আকিদা ও কওমি-দেওবন্দি আদর্শ রক্ষার বিষয়ে বেশ কিছু তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক প্রশ্ন তুলেছেন। এর মধ্যে রয়েছে—
১. আকিদাগত তুলনা ও বিভ্রান্তির আশঙ্কা: মামুনুল হকের একটি বক্তব্যে চার মাজহাব—হানাফি, মালেকি, শাফেয়ি ও হাম্বলি—এর আকিদার সঙ্গে সালাফি ও মওদুদীবাদের আকিদার তেমন কোনো পার্থক্য নেই বলে উল্লেখ করার বিষয়টি চ্যালেঞ্জ করেছেন ওলীপুরী। তার দাবি, চার মাজহাবের আকিদার সঙ্গে সালাফি ও মওদুদীবাদীদের আকিদার মৌলিক ও ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। মামুনুল হকের এমন বক্তব্য সাধারণ আলেম ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি।
২. ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীক নিয়ে আপত্তি: নির্বাচনি প্রচারে জামায়াতে ইসলামীর প্রতীক দাঁড়িপাল্লাকে ইনসাফ ও ওলামায়ে কেরামের প্রতীক হিসেবে আখ্যা দেওয়ার সমালোচনা করেছেন ওলীপুরী। তার প্রশ্ন, যেসব দল আকাবির, সাহাবা ও সালাফদের সঙ্গে বে-ইনসাফি করেছে বলে তিনি মনে করেন, তাদের প্রতীক কীভাবে আলেমদের প্রতীক হতে পারে।
৩. দেওবন্দি-হানাফি আকিদা সংশোধনের আহ্বান: মামুনুল হকের পক্ষ থেকে দেওবন্দি ও হানাফিদের আকিদা সংশোধনের আহ্বানকে অনভিপ্রেত বলে উল্লেখ করেছেন ওলীপুরী। তার মতে, এ ধরনের বক্তব্য শত বছরের ঐতিহ্যের ওপর আঘাতের শামিল।
৪. রাজনৈতিক ঐক্যের নজির: মওদুদীবাদীদের সঙ্গে মামুনুল হকের রাজনৈতিক ঐক্যকে শাইখুল হিন্দ (রহ.)-এর কংগ্রেসের সঙ্গে ঐক্যের উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপনকে বিভ্রান্তিকর বলে দাবি করেছেন ওলীপুরী। চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, মামুনুল হকের বাবা শায়খুল হাদিস মাওলানা আজিজুল হক (রহ.) তাঁর বুখারি শরিফের ব্যাখ্যাগ্রন্থে মওদুদীর বিভিন্ন মতাদর্শের দলিলভিত্তিক খণ্ডন করেছেন। চিঠিতে মওদুদীবাদী বলতে জামায়াতে ইসলামীকে বোঝানো হয়েছে।
৫. ‘আকিদাতুল জিহাদিয়া’ পরিভাষা: জিহাদকে মূল আকিদা হিসেবে উপস্থাপন এবং ‘আকিদাতুল জিহাদিয়া’ পরিভাষা ব্যবহারের শাস্ত্রীয় ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ওলীপুরী। একই সঙ্গে দেওবন্দি আকিদার সঠিক ব্যাখ্যা তুলে ধরার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
মাহফিল স্থগিত, পদত্যাগ সভাপতি-সম্পাদকের
সিলেটে খাদিমুল কোরআন পরিষদের তাফসির মাহফিলে মামুনুল হককে অতিথি করা নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতবিরোধ থেকেই কওমি অঙ্গনে মওদুদীবাদী মতাদর্শের প্রভাব নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ওলীপুরীর চিঠির বিষয়টি সামনে আসে।
পরিষদের চলতি বছরের তাফসির মাহফিল আগামী ১৯, ২০ ও ২১ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। তবে চলমান বিতর্কের কারণে পূর্বনির্ধারিত সময়ে মাহফিল হচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এরই মধ্যে সংগঠনটির সভাপতি মাওলানা মাশুক উদ্দীন ও সাধারণ সম্পাদক মাওলানা আসজাদ পদত্যাগ করেছেন।
পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, পরিস্থিতি পর্যালোচনায় বৃহস্পতিবার আহ্বায়ক কমিটির বৈঠক ডাকা হয়েছে। বৈঠকে পরবর্তী করণীয় নিয়ে আলোচনা এবং নতুন মজলিসে শুরা গঠনের কথা রয়েছে। পরে ১০ নভেম্বর নতুন শুরার বৈঠকে তাফসির মাহফিলের নতুন তারিখ ঘোষণা হতে পারে।
এদিকে তিন মুরুব্বির বক্তব্যে বিষয়টি সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের আগ্রহের কথা উঠে এসেছে। এখন ওলীপুরী কিংবা তিন মুরুব্বির উদ্যোগে আনুষ্ঠানিক যৌথ বৈঠক হয় কি না, সেটিই দেখার বিষয়।
উল্লেখ্য, প্রতিবেদনে মুরুব্বি হিসেবে উল্লেখ করা মাওলানা লিয়াকত আলীকে সম্প্রতি নিজের রাজনৈতিক অভিভাবক হিসেবে উল্লেখ করেছেন মামুনুল হক। তবে মাওলানা মাহফুজুল হক ও অধ্যক্ষ শাহ মুহাম্মদ মিজানুর রহমান চৌধুরীকে তিনি মুরুব্বি হিসেবে অনুসরণ করেন কি না, তা কালবেলা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হতে পারেনি। ওলীপুরীর চিঠি এবং মাহফুজুল হক ও অধ্যক্ষ মিজানুর রহমান চৌধুরীর বক্তব্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনে তাদের মুরুব্বি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এটি কালবেলার নিজস্ব কোনো মূল্যায়ন নয়।
তুলি আক্তার/ অনলাইন ডেস্ক / যোগফল.কম

আপনার মতামত লিখুন