তিতাস হত্যার পর টেকনাফের পাহাড়ে ফের যৌথ বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযান, মিলল তিন মরদেহের সন্ধান
ছবি যোগফল
শাকুর মাহমুদ চৌধুরী ।। যোগফল প্রতিবেদক
শনিবার (৭ নভেম্বর) সকাল সাড়ে ৭টা থেকে টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের লেদা-রঙ্গিখালীর দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় এ অভিযান শুরু হয়। সেনাবাহিনীর ১০ পদাতিক ডিভিশনের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে সেনাবাহিনী, বিজিবি ও পুলিশের দেড় শতাধিক সদস্য অংশ নিয়েছেন। কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে পাহাড়ের বিভিন্ন স্থানে তল্লাশি চালানো হচ্ছে।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) একই এলাকায় যৌথ বাহিনীর অভিযানে মানবপাচারকারীদের একটি গোপন বন্দিশালা থেকে ৫৭ জনকে উদ্ধার করা হয়। এ সময় মানবপাচারকারী চক্রের পাঁচ সদস্যকে আটক করা হয়েছিল।
অভিযান চলাকালে মানবপাচারকারীদের সঙ্গে যৌথ বাহিনীর গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এতে সেনাবাহিনীর সৈনিক মোহাম্মদ তিতাস শেখ (২৭) গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। তাঁর মৃত্যুতে সেনাবাহিনীসহ স্থানীয় জনমনে শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) পাহাড়ে অভিযান অব্যাহত থাকাকালে হ্নীলা ইউনিয়নের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় তিনটি মরদেহ পড়ে থাকার তথ্য পায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তবে দুর্গম অবস্থান ও নিরাপত্তাজনিত কারণে প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত মরদেহগুলো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
উদ্ধার হওয়া এক ভুক্তভোগী শহিদুল ইসলাম দাবি করেন, দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনায় একাধিক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন বলে তিনি শুনেছেন। বন্দিশালার কাছাকাছি তিনটি মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেছেন বলেও জানান তিনি। তবে মরদেহগুলো মানবপাচারকারী চক্রের সদস্য, নাকি বন্দিদশা থেকে পালানোর চেষ্টা করা কোনো ভুক্তভোগীর- তা নিশ্চিত করতে পারেননি তিনি।
কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান জানান, রঙ্গিখালীর পাহাড়ে তিনটি মরদেহ পড়ে থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। তবে উদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত মরদেহের অবস্থান ও পরিচয় নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। বিষয়টি অনুসন্ধানে কাজ করছে পুলিশ।
তিনি আরও জানান, মানবপাচারকারী চক্রের তৎপরতা সম্পূর্ণভাবে নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত যৌথ বাহিনীর অভিযান অব্যাহত থাকবে। উদ্ধার হওয়া ভুক্তভোগীদের বর্ণনায় মানবপাচারকারীদের ভয়াবহ নির্যাতন, প্রতারণা ও জিম্মি করে রাখার চিত্র উঠে এসেছে।
আসাদুজ্জামান নামে এক ভুক্তভোগী জানান, চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে তাঁকে কক্সবাজারে ডেকে আনা হয়। পরে পাহাড়ের একটি গোপন আস্তানায় আটকে রাখা হয়। সেখানে টানা আট দিন বন্দি ছিলেন তিনি। এ সময় দুইবার পালানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ওই বন্দিশালায় ৫০ জনের বেশি মানুষ ছিলেন। তাঁদের সাগরপথে পাচারের প্রস্তুতি চলছিল। সশস্ত্র ব্যক্তিরা পাহাড়ি আস্তানাটি পাহারা দিতেন। বন্দিদের মুঠোফোনসহ ব্যক্তিগত জিনিসপত্রও কেড়ে নেওয়া হয়েছিল।
মানবপাচারকারীদের গুলিতে নিহত সেনাসদস্য মোহাম্মদ তিতাস শেখের মরদেহ শুক্রবার সকালে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে রামু সেনানিবাসে নেওয়া হয়। সেখানে আসরের নামাজের পর তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
পরে হেলিকপ্টারে মরদেহ ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়া ইউনিয়নে তাঁর গ্রামের বাড়িতে পাঠানো হয়। শুক্রবার সন্ধ্যার আগেই মরদেহ সেখানে পৌঁছায়। সামরিক আনুষ্ঠানিকতা শেষে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে দাফন করা হয়। নিহত তিতাস ওই ইউনিয়নের আফজাল হোসেনের ছেলে।
সেনাসদস্য তিতাস শেখকে গুলি করে হত্যার প্রতিবাদ এবং জড়িত অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে টেকনাফ ও উখিয়ায় মিছিল-সমাবেশ করেছে বিএনপি। একই দাবিতে মানববন্ধন করেছেন টেকনাফের সাধারণ ছাত্র-জনতা।
বিক্ষোভকারীরা পাহাড়ে যৌথ বাহিনীর অভিযান অব্যাহত রাখা, মানবপাচারকারী চক্রের সব আস্তানা ধ্বংস এবং দুর্গম পাহাড়ি এলাকাকে অপরাধমুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম শুক্রবার জানান, পাহাড়ে যৌথ বাহিনীর অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত পরে জানানো হবে।
সব মিলিয়ে, সেনাসদস্য তিতাস শেখের আত্মত্যাগের পর টেকনাফের পাহাড়ে মানবপাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে নতুন করে শুরু হওয়া অভিযান এখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তিনটি মরদেহ উদ্ধারের পরই জানা যেতে পারে, এই রহস্যের পেছনে কারা রয়েছে এবং পাহাড়ের অপরাধজগতের সঙ্গে তাদের সংশ্লিষ্টতা কতটুকু।

আপনার মতামত লিখুন