গৃহবধূ থেকে ‘আপসহীন নেত্রী
বাংলাদেশের রাজনীতির দীর্ঘ পথপরিক্রমায় কিছু নাম শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ে সীমাবদ্ধ থাকে না, সময়ের সঙ্গে তারা হয়ে ওঠেন একটি রাজনৈতিক অধ্যায়ের প্রতীক। বেগম খালেদা জিয়া তেমনই এক নাম। একসময় সাধারণ এক গৃহবধূ হিসেবে সংসার ও সন্তান লালন-পালনেই যার ব্যস্ততা ছিল, ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে স্বামী রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর তাকেই নামতে হয় রাজনীতির কঠিন ময়দানে। এরপর দীর্ঘ চার দশকের রাজনৈতিক জীবনে আন্দোলন, সংগ্রাম, কারাবরণ, রাষ্ট্রক্ষমতা ও বিরোধী দলের নেতৃত্ব—সবকিছু মিলিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী নারী নেত্রী।
স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে আপসহীন অবস্থান, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবি এবং রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মুখেও দৃঢ় থাকার কারণে তিনি অর্জন করেন ‘আপসহীন নেত্রী’ উপাধি। তিনবার দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং মুসলিম বিশ্বের অন্যতম নির্বাচিত নারী সরকারপ্রধান হিসেবেও ইতিহাসে স্থান করে নেন।
শনিবার (১৫ আগস্ট) বেগম খালেদা জিয়ার ৮২তম জন্মদিন। গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর মৃত্যুর পর এবারই প্রথম তার অনুপস্থিতিতে জন্মদিন পালিত হচ্ছে। জন্মদিনে তাকে স্মরণ করছেন বিএনপির নেতাকর্মী, সমর্থক ও দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
জন্ম ও শৈশব
বেগম খালেদা জিয়া ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট ভারতের জলপাইগুড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। জন্মের পর জীবনের প্রথম কয়েকটি বছর সেখানেই কাটে। ১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান বিভক্তির পর তার বাবা ইস্কান্দার মজুমদার পরিবার নিয়ে দিনাজপুরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।
দিনাজপুরেই খালেদা জিয়ার শৈশব ও শিক্ষাজীবনের বড় অংশ কাটে। পাঁচ বছর বয়সে তাকে দিনাজপুরের সেন্ট জোসেফ কনভেন্টে ভর্তি করা হয়। পরে দিনাজপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৬০ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। এরপর দিনাজপুর সুরেন্দ্রনাথ কলেজে ভর্তি হয়ে ১৯৬৩ সালে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।
তার বাবা ইস্কান্দার মজুমদার ছিলেন ব্যবসায়ী। মা তৈয়বা মজুমদার ছিলেন সমাজকর্মী। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে খালেদা জিয়া ছিলেন তৃতীয় সন্তান।
বিবাহ ও সংসার জীবন
১৯৬০ সালের ৫ আগস্ট দিনাজপুরের মুদিপাড়ায় সেনাবাহিনীর তরুণ কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে খালেদা খানম পুতুলের বিয়ে হয়। বিয়ের পর স্বামীর কর্মস্থলের কারণে তাকে দেশের বিভিন্ন স্থানে বসবাস করতে হয়।
জিয়াউর রহমানের কর্মসূত্রে ১৯৬৫ সালে তিনি স্বামীর সঙ্গে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানেও অবস্থান করেন। তাদের দুই সন্তান—বড় ছেলে তারেক রহমান এবং ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো।
জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন খালেদা জিয়া সরাসরি রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন না। বরং দুই সন্তানকে মানুষ করা ও সংসার সামলানোতেই তার জীবনের বড় সময় কেটেছে।
মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল দিনগুলো
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ খালেদা জিয়ার জীবনেও নিয়ে আসে চরম অনিশ্চয়তা। স্বাধীনতার সূচনালগ্নে মেজর জিয়াউর রহমান পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। অন্যদিকে দুই সন্তানকে নিয়ে বিপদের মধ্যে পড়েন খালেদা জিয়া।
প্রথমদিকে তিনি চট্টগ্রামে আত্মগোপনে ছিলেন। পরে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠলে সন্তানদের নিয়ে চট্টগ্রাম থেকে নারায়ণগঞ্জে এবং সেখান থেকে ঢাকায় আসেন। বিভিন্ন সময় স্বজন ও পরিচিতজনদের বাসায় আত্মগোপনে থাকার পর ১৯৭১ সালের ২ জুলাই সিদ্ধেশ্বরীর একটি বাসা থেকে তাকে আটক করা হয়।
পরে দুই সন্তানসহ তাকে পুরোনো সংসদ ভবনে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখান থেকে ঢাকা সেনানিবাসের একটি বাসায় বন্দি রাখা হয়। ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হওয়া পর্যন্ত তিনি সেনা হেফাজতেই ছিলেন।
স্বামীর মৃত্যু, বদলে গেল জীবন
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে এক সামরিক অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হন। মৃত্যুর আগের রাতে তিনি স্ত্রী খালেদা জিয়াকে ফোন করে পরদিন ঢাকায় ফেরার কথা জানিয়েছিলেন। সেটিই হয়ে ওঠে তাদের শেষ কথা।
স্বামীর আকস্মিক মৃত্যুর পর ভেঙে পড়েন খালেদা জিয়া। দীর্ঘ ২১ বছরের দাম্পত্য জীবনের অবসান তাকে এক কঠিন বাস্তবতার সামনে দাঁড় করায়। তখনও রাজনীতিতে তার কোনো সক্রিয় ভূমিকা ছিল না।
কিন্তু জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বিএনপি যখন নানা অভ্যন্তরীণ সংকট ও ভাঙনের মুখে পড়ে, তখন দলের নেতাকর্মীরা খালেদা জিয়ার দিকে তাকান।
গৃহবধূ থেকে রাজনীতির ময়দানে
১৯৮২ সালে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সামরিকভাবে ক্ষমতা দখল করলে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও অস্থির হয়ে ওঠে। বিএনপির ভেতরেও দেখা দেয় বিভক্তি।
এই সময়ই অনেকটা আকস্মিকভাবে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন খালেদা জিয়া। ১৯৮২ সালে বিএনপির সাধারণ সদস্য হিসেবে যোগ দেওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আসেন। ১৯৮৩ সালে ভাইস চেয়ারম্যান এবং ১৯৮৪ সালের আগস্টে বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।
এরপর শুরু হয় তার দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম।
স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন ও ‘আপসহীন নেত্রী’
এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন খালেদা জিয়া। ১৯৮৩ সালে গঠিত সাতদলীয় জোটের নেতৃত্বও দেন তিনি।
১৯৮৬ সালের বিতর্কিত নির্বাচন বর্জনসহ এরশাদবিরোধী আন্দোলনে তার কঠোর অবস্থান তাকে ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিত করে তোলে। আন্দোলনের সময় তাকে একাধিকবার আটক করা হয়।
ক্রমেই তীব্র হতে থাকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ছাত্রসংগঠনের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে রাজপথ উত্তাল হয়ে ওঠে।
অবশেষে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর গণঅভ্যুত্থানের মুখে এরশাদের পতন ঘটে। স্বৈরাচারবিরোধী সেই আন্দোলনে খালেদা জিয়ার ভূমিকা তাকে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে।
প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী
১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। খালেদা জিয়া নিজে পাঁচটি আসনে নির্বাচন করে সবকটিতেই জয়ী হন।
১৯৯১ সালের ১৯ মার্চ তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইতিহাস সৃষ্টি করেন।
তার প্রথম মেয়াদে দেশে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। শিক্ষা, নারী কর্মসংস্থান, রপ্তানিমুখী শিল্প এবং অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়।
তৈরি পোশাক খাতের সম্প্রসারণ ও নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ বৃদ্ধিও ওই সময়ের অন্যতম উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হিসেবে উঠে আসে।
১৯৯৬ সালে দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী
১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় এবং খালেদা জিয়া দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন।
তবে বিরোধী দল আওয়ামী লীগের আন্দোলন ও টানা হরতালের কারণে রাজনৈতিক সংকট তীব্র হয়। একপর্যায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা চালুর দাবি জোরালো হলে খালেদা জিয়ার সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রবর্তনের জন্য সংবিধান সংশোধন করে।
এরপর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে নতুন নির্বাচনের পথ তৈরি করেন তিনি।
১৯৯৬ সালের নির্বাচন ও বিরোধী দলীয় নেতৃত্ব
১৯৯৬ সালের ১২ জুন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বিএনপি সরকার গঠন করতে না পারলেও ১১৬টি আসন পেয়ে বড় বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
খালেদা জিয়াও পাঁচটি আসন থেকে নির্বাচিত হন। এরপর তিনি সংসদে বিরোধী দলের নেত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
চারদলীয় জোট ও তৃতীয়বার প্রধানমন্ত্রী
১৯৯৯ সালে বিএনপির নেতৃত্বে চারদলীয় জোট গঠিত হয়। বিএনপির সঙ্গে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টি ও ইসলামী ঐক্যজোট জোটে যুক্ত হয়।
২০০১ সালের ১ অক্টোবর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।
এর মধ্য দিয়ে তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন খালেদা জিয়া।
২০০১-২০০৬: তৃতীয় মেয়াদের সরকার
এই মেয়াদে নারী শিক্ষা, প্রাথমিক শিক্ষা, কর্মসংস্থান, অবকাঠামো উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়।
মেয়েদের শিক্ষায় উপবৃত্তি, বিনামূল্যে শিক্ষা, খাদ্য সহায়তা এবং নারী ক্ষমতায়নের নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। ২০০৫ সালে ফোর্বস ম্যাগাজিনের বিশ্বের ক্ষমতাধর নারীদের তালিকায় খালেদা জিয়া ২৯তম অবস্থানে ছিলেন।
এক-এগারো ও কারাবরণ
২০০৬ সালে সংবিধান অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন খালেদা জিয়া। কিন্তু ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে জরুরি অবস্থা জারি হয় এবং সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসে।
একপর্যায়ে বিএনপির ওপর চাপ সৃষ্টি এবং দল ভাঙার নানা প্রচেষ্টা শুরু হয়। ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ভোরে ঢাকা সেনানিবাসের বাসা থেকে খালেদা জিয়া ও তার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এর আগে ৭ মার্চ গ্রেপ্তার হন তারেক রহমান।
খালেদা জিয়াকে জাতীয় সংসদ ভবন এলাকার একটি বাড়িতে সাবজেল হিসেবে আটক রাখা হয়। দীর্ঘ এক বছরের বেশি সময় কারাবন্দি থাকার পর ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তিনি মুক্তি পান।
২০০৮ সালের নির্বাচন ও বিরোধী দলের নেতৃত্ব
সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেয় এবং বিরোধী দলে অবস্থান নেয়।
খালেদা জিয়া তিনটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সবকটিতে জয়ী হন এবং সংসদে বিরোধীদলীয় নেত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
রাজনৈতিক সংকট ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে আন্দোলন
পরবর্তী সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনীতিতে নতুন সংকট তৈরি হয়। বিএনপি নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলোর বর্জনের মধ্যে অনুষ্ঠিত হয়। এরপরও বিএনপির আন্দোলন অব্যাহত থাকে।
খালেদা জিয়াকে তার রাজনৈতিক কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করে রাখার অভিযোগ, রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বাধা এবং বিএনপি নেতাকর্মীদের ব্যাপক গ্রেপ্তার নিয়ে সে সময় দেশজুড়ে তীব্র রাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।
মামলা ও কারাবাস
২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়াকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তাকে পুরান ঢাকার পুরোনো কেন্দ্রীয় কারাগারে রাখা হয়।
পরে জিয়া চ্যারিট্যাবল ট্রাস্ট মামলাতেও তাকে সাজা দেওয়া হয়। দীর্ঘ কারাবাস ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্যে তার শারীরিক অবস্থারও অবনতি হতে থাকে।
২০২০ সালের ২৫ মার্চ করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যে সরকারের নির্বাহী আদেশে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি পান তিনি।
অসুস্থতা ও চিকিৎসা
কারাবন্দি থাকা অবস্থায় খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। কিডনি, লিভার, ডায়াবেটিস, আর্থ্রাইটিসসহ বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় তিনি ভুগতে থাকেন।
তার চিকিৎসা নিয়ে দেশে-বিদেশে ব্যাপক আলোচনা হয়। উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেওয়ার দাবিও জানায় বিএনপি ও তার পরিবার।
২০১৮ সালের নির্বাচন ও পরবর্তী আন্দোলন
২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট অংশ নেয়। নির্বাচনে বিএনপি জোট বড় ধরনের পরাজয়ের মুখে পড়ে।
এরপর নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন এবং গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে বিএনপি আন্দোলন চালিয়ে যায়।
২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান ও মুক্তির নতুন অধ্যায়
২০২৪ সালে কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে ব্যাপক আন্দোলন শুরু হয়। একপর্যায়ে আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়।
৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন আসে। এরপর খালেদা জিয়ার মুক্তির পথও পুরোপুরি উন্মুক্ত হয়।
দীর্ঘ রাজনৈতিক নিপীড়ন, মামলা, কারাবাস ও অসুস্থতার পর তিনি নতুন বাস্তবতায় ফিরে আসেন।
শেষ অধ্যায়
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে খালেদা জিয়া যেমন তিনবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, তেমনি একাধিকবার বিরোধী দলের নেতৃত্বও দিয়েছেন। রাজপথের আন্দোলন থেকে রাষ্ট্র পরিচালনা—দুই ক্ষেত্রেই তার ছিল দীর্ঘ অভিজ্ঞতা।
স্বামী জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর যে নারী রাজনীতিতে পা রেখেছিলেন, সময়ের পরিক্রমায় তিনিই হয়ে ওঠেন বিএনপির অবিসংবাদিত নেতা। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে নানা বিতর্ক, বিরোধ, মামলা, আন্দোলন ও সংকটের মধ্যেও তিনি দলের নেতৃত্ব ধরে রাখেন।
বিএনপির চেয়ারপারসন ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। তার জানাজায় বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেন এবং দেশজুড়ে শোকের আবহ তৈরি হয়।
তার মৃত্যুর পরও বাংলাদেশের রাজনীতিতে তার নাম, রাজনৈতিক অবস্থান ও দীর্ঘ সংগ্রামের অধ্যায় আলোচনায় রয়েছে।
গৃহবধূ থেকে ইতিহাসের অংশ
খালেদা জিয়ার জীবনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি সম্ভবত এখানেই—যে নারী একসময় রাজনীতি থেকে সম্পূর্ণ দূরে ছিলেন, স্বামীর মৃত্যুর পর তিনিই হয়ে ওঠেন একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলের প্রধান। এরপর রাজপথের আন্দোলন থেকে রাষ্ট্রক্ষমতা—প্রতিটি অধ্যায়েই রেখে যান নিজের রাজনৈতিক ছাপ।
সমর্থকদের কাছে তিনি গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতির প্রতীক, আর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কাছে ছিলেন দীর্ঘদিনের শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী। কিন্তু মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়ার অবস্থান যে গুরুত্বপূর্ণ, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
একজন সাধারণ গৃহবধূ থেকে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী, তিনবারের সরকারপ্রধান এবং ‘আপসহীন নেত্রী’ হয়ে ওঠার এই দীর্ঘ পথচলাই বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় অধ্যায়।
সাদিয়া পারভিন / অনলাইন ডেস্ক / যোগফল.কম

আপনার মতামত লিখুন