যোগফল প্রতিবেদক:
চোখেমুখে ক্লান্তি, কপালে দুশ্চিন্তার ছাপ। দুর্গম পাহাড়ি পথে দিনের পর দিন হাঁটছেন পঞ্চাশোর্ধ্ব তালকা সাদা। পায়ের ব্যথা, ক্ষুধা আর অনিশ্চয়তা—কোনো কিছুই তাকে থামাতে পারছে না। একমাত্র ছেলে বিনোদকে খুঁজে পেতে নেপালের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে বেড়াচ্ছেন তিনি।
নেপালের দক্ষিণাঞ্চলের সমতলভূমি তরাই অঞ্চলের সপ্তারি জেলার বাসিন্দা তালকা। গত ২৬ আগস্ট ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় উত্তর নেপালের বিস্তীর্ণ এলাকায় ঘরবাড়ি, সেতু, স্কুল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংস হওয়ার পর থেকে ১৯ বছর বয়সী বিনোদের কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না।
বন্যার এক দিন আগে ছেলের সঙ্গে শেষবার কথা হয়েছিল তালকার। প্রায় এক মাস আগে রাশুয়া জেলায় একটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে শ্রমিকের কাজ করতে গিয়েছিলেন বিনোদ। সেখানে সিমেন্ট মেশানোসহ বিভিন্ন কাজে যুক্ত ছিলেন তিনি। তার সঙ্গে কাজ করা ১৭ থেকে ১৯ বছর বয়সী আরও চার তরুণও বন্যার পর নিখোঁজ রয়েছেন।
ছেলেকে হারানোর কষ্টের কথা বলতে গিয়ে তালকা বলেন, তার স্ত্রী ছেলের জন্য ভেঙে পড়েছেন। তিনিও গভীর কষ্টের মধ্যে রয়েছেন এবং কী করবেন, তা বুঝতে পারছেন না।
ধার করা দুই হাজার রুপি নিয়ে যাত্রা
ছেলেকে খুঁজতে বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় একটি ধূসর ব্যাকপ্যাক সঙ্গে নেন তালকা। বৃষ্টি থেকে বাঁচতে গায়ে জড়ান কমলা রঙের পলিথিন। পকেটে ছিল দুই হাজার নেপালি রুপিরও কম টাকা। মার্কিন মুদ্রায় যার মূল্য প্রায় ১৩ ডলার। এই অর্থও তাকে ধার করতে হয়েছে।
তালকা জানান, প্রতি ১০০ নেপালি রুপি ধার নেওয়ার বিপরীতে তাকে ২০ রুপি সুদ দিতে হবে। সেই টাকা নিয়ে ভাইকে সঙ্গে করে সপ্তারি থেকে বাসে কাঠমান্ডু যান তিনি। প্রায় ২৯২ কিলোমিটারের এই পথ পাড়ি দিতে পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির কারণে প্রায় নয় ঘণ্টা সময় লাগে।
কাঠমান্ডু পৌঁছে দুই ভাই একের পর এক হাসপাতালে খোঁজ করেন। বন্যাকবলিত এলাকা থেকে অনেক আহত ও মৃত মানুষকে রাজধানীতে আনা হয়েছিল। হাসপাতালের মর্গের বাইরে থাকা ছবি দেখেও বিনোদকে শনাক্ত করতে পারেননি তারা।
উদ্ধার হওয়া অনেক মরদেহ পচে যাওয়া কিংবা খণ্ডিত অবস্থায় থাকায় শনাক্তকরণও কঠিন হয়ে পড়েছে। তবু কোথাও বিনোদের নাম বা ছবি না পেয়ে হতাশ হন তারা।
দুর্গম পথে ছেলের সন্ধানে
কাঠমান্ডু থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরের নুয়াকোটের দিকে এরপর হাঁটা শুরু করেন তালকা ও তার ভাই। ধারণা করা হচ্ছে, সেখানেই বিনোদ যে জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে কাজ করতেন সেটি অবস্থিত।
ভাঙা সড়ক পেরিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাঁটার পর তারা পৌঁছান ত্রিশুলি শহরে। বন্যার ধ্বংসাবশেষ, কাদা ও পলিতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে শহরটির বিভিন্ন এলাকা।
তালকা জানান, আগের রাতে একটি আবাসিক হোটেলে থাকার জন্য তাদের ১ হাজার ৫০০ নেপালি রুপি খরচ হয়েছে। বিনিময়ে সামান্য খাবার দেওয়া হয়েছিল। আরও এক রাত সেখানে থাকলে তাদের হাতে থাকা সব টাকা শেষ হয়ে যাবে।
মর্গ ও সেনাশিবিরে যেতে চান
তালকা ও তার ভাইয়ের দাবি, তারা শুধু মর্গ ও উদ্ধারকাজে নিয়োজিত সেনাশিবিরগুলোতে গিয়ে নিখোঁজদের তালিকা এবং মরদেহগুলো দেখতে চান। কিন্তু তাদের বারবার ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তারা।
তাদের অভিযোগ, মাধেসি ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সদস্য হওয়ায় তারা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। তালকার পরিবার ‘মুসাহার’ সম্প্রদায়ের, যেটি তরাই অঞ্চলের একটি অত্যন্ত প্রান্তিক জনগোষ্ঠী।
তালকা বলেন, তারা দরিদ্র হওয়ায় এবং মাধেসি ও বিহারি হিসেবে পরিচিত হওয়ায় তাদের সঙ্গে বৈষম্য করা হচ্ছে। নেপালি ভাষায় সাবলীলভাবে কথা বলতে না পারায় এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তার ভাষ্য, ছেলে জীবিত থাকুক বা না থাকুক, অন্তত তার মরদেহটি দেখার অধিকার তাদের রয়েছে।
নেপালি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ভয়াবহ বন্যায় এক হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। হাজারো মানুষ নিখোঁজ হওয়ার পরও উদ্ধারকারী দলগুলো জীবিতদের উদ্ধারে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় কাজ করে যাচ্ছে।
সাদিয়া পারভিন / অনলাইন ডেস্ক / যোগফল.কম
আপনার মতামত লিখুন