যমুনায় সরকারি ওষুধ ফেলার ঘটনায় ঘাটাইল হাসপাতালে দুদকের তদন্ত
ছবি সংগৃহীত
নিজস্ব প্রতিবেদক:
টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ট্রাকভর্তি সরকারি ওষুধ যমুনা নদীতে ফেলার সময় আটক ও জব্দের ঘটনায় তদন্ত শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ঘটনার প্রায় এক মাস পর সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও জব্দ করা ওষুধ পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়ে তদন্ত কার্যক্রম শুরু করে সংস্থাটি।
সোমবার সকাল থেকে দুদক টাঙ্গাইলের উপপরিচালক ফখরুল ইসলামের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি দল টাঙ্গাইলের সিভিল সার্জন কার্যালয়, ঘাটাইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ঘাটাইল থানায় পর্যায়ক্রমে অভিযান চালায়।
অভিযানকালে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পরিত্যক্ত ভবন, আবাসিক কক্ষ ও টয়লেটের মেঝেতে বিপুল পরিমাণ সরকারি ওষুধ অগোছালো অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে তদন্ত দল। এসব ওষুধের মধ্যে কতগুলো মেয়াদোত্তীর্ণ এবং কতগুলো ব্যবহারযোগ্য, সে বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সুনির্দিষ্ট তথ্য বা পূর্ণাঙ্গ তালিকা দেখাতে পারেনি বলে জানিয়েছে দুদক।
দুদক টাঙ্গাইলের উপপরিচালক ফখরুল ইসলাম বলেন, কমিশনের নির্দেশে অভিযান ও তদন্ত কার্যক্রম শুরু হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে গাফিলতি, অনিয়ম, আলামত নষ্ট এবং ঘটনাটি ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে। দীর্ঘদিন ধরে ওষুধ ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম হয়ে থাকতে পারে বলেও প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, গণমাধ্যমে প্রকাশিত জব্দ করা ওষুধের বস্তার সঙ্গে ঘাটাইল থানায় জব্দ দেখানো ওষুধের বস্তার মধ্যে ব্যাপক গড়মিল পাওয়া গেছে। থানায় তুলনামূলক কম পরিমাণ ওষুধের বস্তা জব্দ দেখানো হয়েছে। হাসপাতালে থাকা ওষুধ এখনো শ্রেণিবিন্যাস করে সংরক্ষণ করা হয়নি। ফলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তদন্তকারীদের কাছে ওষুধের পূর্ণাঙ্গ রেকর্ডপত্র উপস্থাপন করতে পারেনি।
হাসপাতাল-সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তিনটি তদন্ত কমিটি গঠনের কথা জানিয়েছে। তবে ঘটনার প্রায় এক মাস পার হলেও এসব কমিটির কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি বলে জানিয়েছেন দুদক কর্মকর্তারা।
সরকারি সম্পদ আত্মসাতের বিষয়টি আড়াল করতে ঘটনাটিকে চুরির মামলা হিসেবে দেখিয়ে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ফখরুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ওষুধের পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি না করা এবং হাসপাতালের তত্ত্বাবধানে থাকা ওষুধের মজুত, চাহিদা ও বিতরণের সুনির্দিষ্ট হিসাব না থাকার বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তিনি বলেন, হাসপাতালে ওষুধ সরবরাহ ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পাশাপাশি বাইরের ওষুধ কোম্পানির লোকজনের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগসাজশ রয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে।
দুদক কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ঘটনার প্রকৃত কারণ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তদন্ত শেষে কমিশনের কাছে সুপারিশ করা হবে। এরপর সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সোমবার বেলা ১১টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত এ তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। এতে দুদক টাঙ্গাইলের উপপরিচালক ফখরুল ইসলাম, উপসহকারী পরিচালক তারেক মিয়া ও উপসহকারী পরিচালক বাছেদ আলী অংশ নেন।
যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত
এর আগে গত ২৬ আগস্ট রাতে ঘাটাইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে ট্রাকভর্তি অন্তত ৫০ বস্তা সরকারি ওষুধ পার্শ্ববর্তী ভূঞাপুর উপজেলার যমুনা নদীতে ফেলার সময় স্থানীয়রা তা আটক করেন। পরে পুলিশকে খবর দেওয়া হলে পিকআপসহ ওষুধগুলো জব্দ করা হয়। এ ঘটনায় একটি চুরির মামলা করা হয়।
মামলায় ট্রাকচালক আজমতকে আটক দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। ঘটনার পর থেকে তিনি কারাগারে রয়েছেন।
ঘটনার পর গত ২৯ আগস্ট প্রকাশিত এক প্রজ্ঞাপনে ঘাটাইল উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আবু নয়িম মুহাম্মদ সোহেলকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়। পরে প্রতিষ্ঠানটির অফিস সহকারী কাম-কম্পিউটার অপারেটর ফরহাদ হোসেনকে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়।
তবে ঘাটাইল উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) আলমগীর কবির সুমন বলেন, দুদকের তদন্তের বিষয়ে তারা এখনো কোনো কাগজপত্র পাননি। হাসপাতাল সম্পর্কে করা অভিযোগগুলো পুরোপুরি সত্য নয়।

আপনার মতামত লিখুন