কক্সবাজার সৈকতে লাখো মানুষের ঢল, ৪৫ মিনিটে বিসর্জন ৩৮০ প্রতিমা
ছবি সংগৃহীত
শাকুর মাহমুদ চৌধুরী, কক্সবাজার:
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে লাখো মানুষের উপস্থিতিতে শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দুর্গাপূজার প্রতিমা বিসর্জন উৎসব। বুধবার (২১ অক্টোবর) বিকেলে সৈকতের লাবণী পয়েন্টসহ প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে এই উৎসবকে ঘিরে মানুষের ঢল নামে। আয়োজকদের হিসাবে, বিসর্জন উৎসবে তিন লাখের বেশি দর্শনার্থী অংশ নেন। মাত্র ৪৫ মিনিটে একে একে ৩৮০টি প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়।
বুধবার দুপুর থেকেই কক্সবাজার শহরের লাবণী, সিগাল, সুগন্ধা ও কলাতলী পয়েন্ট এলাকায় জড়ো হতে থাকেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। বিভিন্ন পূজামণ্ডপ থেকে ট্রাকে করে প্রতিমা নিয়ে আসেন ভক্তরা। পরে কাঁধে করে কিংবা ভ্যানে করে প্রতিমাগুলো সৈকতের বালুচরে নেওয়া হয়। বিকেল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে প্রতিমা বিসর্জনস্থলে বাড়তে থাকে মানুষের উপস্থিতি।
বিকেল পাঁচটার দিকে মন্ত্রপাঠের মধ্য দিয়ে শুরু হয় বিসর্জনের আনুষ্ঠানিকতা। বিকেল ৫টা ৯ মিনিটে বঙ্গোপসাগরে প্রতিমা বিসর্জন শুরু হয়। এরপর একে একে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়। ৪৫ মিনিটের মধ্যেই ৩৮০টি প্রতিমা বিসর্জন সম্পন্ন হয়।
বিজয়া দশমীর আনুষ্ঠানিকতা শেষে কক্সবাজার শহর, সদর উপজেলা, উখিয়া, টেকনাফ, রামু ও ঈদগাঁওয়ের বিভিন্ন পূজামণ্ডপ থেকে প্রতিমা নিয়ে আসা হয় সৈকতে। এর আগে মণ্ডপগুলোতে পূজার ঘণ্টাধ্বনি, ঢাকের বাদ্য, পুরোহিতদের মন্ত্রপাঠ ও ফুলের অঞ্জলির মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গাকে বিদায় জানান ভক্তরা।
সৈকতের বালুচরে প্রতিমা ঘিরে শেষ মুহূর্তের পূজা-অর্চনা করেন ভক্তরা। অনেকে সিঁদুর খেলায় অংশ নেন। দেবীর কপালে ও পায়ে সিঁদুর ছুঁইয়ে প্রণাম করার পাশাপাশি একে অপরকে সিঁদুর পরিয়ে দেন তাঁরা। উৎসবের আনন্দের মধ্যেও দেবী দুর্গার বিদায়বেলায় অনেকের চোখেমুখে ছিল বিষাদের ছাপ।
শহরের বৈদ্যঘোনা এলাকার বাসিন্দা বিশ্বজিৎ পাল বলেন, দেবীর বিদায়ে মন খারাপ হলেও উৎসবের আনন্দ সবাই ভাগাভাগি করে নিয়েছেন। তাঁরা জগতের সব মানুষের মঙ্গল কামনা করেন।
ঘোনাপাড়ার কলেজছাত্রী আলপনা দাশ বলেন, লাখো মানুষের উপস্থিতিতে দেবীকে বিদায় জানাতে পেরে তিনি শান্তি পেয়েছেন। তবে মা চলে যাওয়ায় তাঁর মন ভারাক্রান্ত হয়ে পড়েছে।
এবার কক্সবাজার জেলায় মোট ৩২৪টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে ১৫৫টি মণ্ডপে প্রতিমাপূজা এবং ১৬৯টিতে ঘটপূজা হয়। উপজেলাগুলোর মধ্যে চকরিয়ায় সর্বোচ্চ ৭১টি মণ্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ ছাড়া কুতুবদিয়ায় ৪৪টি, রামুতে ৩৭টি, কক্সবাজার সদরে ৩১টি, ঈদগাঁওয়ে ২৯টি, মহেশখালীতে ২৮টি, কক্সবাজার পৌরসভায় ২৬টি, চকরিয়া পৌরসভায় ২৫টি, পেকুয়ায় ৯টি, উখিয়ায় ৯টি, মহেশখালী পৌরসভায় ৬টি ও টেকনাফে ৬টি মণ্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হয়।
প্রতিমা বিসর্জন উৎসবকে কেন্দ্র করে দুপুর থেকে সমুদ্রসৈকত ও শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে চার স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়। সেনাবাহিনী, পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), আনসারসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করেন।
কক্সবাজার জেলা পূজা উদ্যাপন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি উদয় শংকর পাল বলেন, গত বছরের মতো এবারও শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিমা বিসর্জন উৎসব সম্পন্ন হয়েছে। এ আয়োজনের মধ্য দিয়ে আবারও প্রমাণিত হয়েছে, পর্যটন শহর কক্সবাজার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির শহর।
তিনি উৎসব সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে সহযোগিতা করায় জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
প্রতিমা বিসর্জন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন বলেন, দেশের প্রধান পর্যটনকেন্দ্র কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতকে আরও আকর্ষণীয় করে গড়ে তুলতে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে। পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি পর্যটন নগরীকে নতুনভাবে সাজানোর কাজ চলছে।
তিনি বলেন, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের কয়েক লাখ মানুষের উপস্থিতিতে এই বৃহৎ প্রতিমা বিসর্জন উৎসব প্রমাণ করেছে, কক্সবাজার সম্প্রীতির শহর। যেকোনো মূল্যে এই সম্প্রীতি ধরে রাখতে হবে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী, লুৎফর রহমান কাজল ও শামীম আরা স্বপ্না, জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান, কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মুহাম্মদ জসিম উদ্দিন, পুলিশ সুপার এ এম সাজেদুর রহমান, রামকৃষ্ণ মিশন কক্সবাজারের সভাপতি ও শিক্ষাবিদ সোমেশ্বর চক্রবর্তী, হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ট্রাস্টি দোলন ধর এবং দীপক শর্মা।
বক্তারা বলেন, এ ধরনের উৎসব দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে আরও সুদৃঢ় করে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জেলা পূজা উদ্যাপন পরিষদের সভাপতি উদয় শংকর পাল। সঞ্চালনা করেন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক স্বপন দাশ।
সার্বিকভাবে, বিপুল জনসমাগম, সুশৃঙ্খল আয়োজন ও নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্য দিয়ে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে দুর্গাপূজার প্রতিমা বিসর্জন উৎসব সম্পন্ন হয়।
তুলি আক্তার/ অনলাইান ডেস্ক/ যোগফল. কম

আপনার মতামত লিখুন