রাজবাড়ীতে সারের সংকট, বাড়তি দামে বিক্রির অভিযোগ
যোগফল প্রতিবেদক:
রাজবাড়ীতে চলতি রোপা আমন মৌসুমে সারের সংকট দেখা দেওয়ায় বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। বিশেষ করে টিএসপি ও ডিএপি সার চাহিদা অনুযায়ী না পাওয়ার পাশাপাশি সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। তবে কৃষি বিভাগ বলছে, জেলায় সার সংকট নেই; বরং জমিতে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি রাসায়নিক সার ব্যবহারের কারণে চাহিদা বেড়েছে।
জেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে রাজবাড়ীতে প্রায় ৫২ হাজার হেক্টর জমিতে রোপা আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এরই মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশ জমিতে আমন আবাদ শেষ হয়েছে। রোপা আমন ও পেঁয়াজের মৌসুমে জেলায় সারের চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে।
ডিলারদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর জেলায় টিএসপি সারের চাহিদা ৬ হাজার ১১ মেট্রিক টন হলেও বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৩ হাজার ১ মেট্রিক টন। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ প্রায় অর্ধেক।
এ ছাড়া ডিএপি সারের চাহিদা ২৬ হাজার ৮৪৫ মেট্রিক টন, বরাদ্দ ১৬ হাজার ৭১৮ মেট্রিক টন। এমওপি সারের চাহিদা ২৩ হাজার ৭৬০ মেট্রিক টন, বরাদ্দ ৯ হাজার ৭৭৯ মেট্রিক টন। ইউরিয়ার চাহিদা ৩০ হাজার ১৫৫ মেট্রিক টন হলেও বরাদ্দ হয়েছে ২২ হাজার ৪৭৪ মেট্রিক টন। জিপসামের চাহিদা ২২ হাজার ৮৯ মেট্রিক টন, বিপরীতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে মাত্র ৬ হাজার ৯৭৮ মেট্রিক টন।
ডিলারদের দাবি, চাহিদা ও বরাদ্দের বড় ব্যবধানের কারণেই বাজারে সারের সংকট তৈরি হয়েছে।
পাংশা উপজেলার সরিষা ইউনিয়নের কৃষক কার্তিক শীল বলেন, ধানের চারা রোপণের সময় টিএসপি ও ডিএপি এবং পরে ইউরিয়া সার প্রয়োজন হয়। কিন্তু দোকানে গিয়ে চাইলেও অনেক সময় সার পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে সার ছাড়াই ধান রোপণ করতে হচ্ছে তাঁকে।
তিনি অভিযোগ করেন, সরকার নির্ধারিত দামে সার পাওয়া যাচ্ছে না। তাঁর দাবি, ৫০ কেজির এক বস্তা টিএসপি ও ইউরিয়া কিনতে ১ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে, যেখানে সরকার নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৩৫০ টাকা।
রাজবাড়ী সদর উপজেলার মিজানপুর ইউনিয়নের কৃষক তুফান মণ্ডলও একই অভিযোগ করেন। তাঁর ভাষ্য, টিএসপি ও ইউরিয়া এক বস্তা করে ১ হাজার ৮০০ টাকা দরে কিনেছেন। সারের দাম বাড়ায় তাঁদের উৎপাদন খরচও বেড়ে যাচ্ছে বলে জানান তিনি।
রাজবাড়ী সার ডিলার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. রেজাউল হক বাদশা বলেন, ডিলাররা যে পরিমাণ সারের চাহিদা দিয়েছেন, সেই অনুযায়ী বরাদ্দ না পাওয়াই সংকটের অন্যতম কারণ। বরাদ্দের একটি অংশ আবার সাব-ডিলারদের মধ্যে ভাগ করে দিতে হয়। ফলে চাহিদার মৌসুমে সরবরাহ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
একাধিক সাব-ডিলারের দাবি, বরাদ্দকৃত সার মাসের শুরুতেই শেষ হয়ে যাওয়ায় তাঁদের অন্য জেলা থেকে বাড়তি দামে সার সংগ্রহ করতে হচ্ছে। এতে পরিবহনসহ বিভিন্ন অতিরিক্ত খরচ যুক্ত হয়ে কৃষকের কাছে বেশি দামে সার বিক্রির পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।
একজন সাব-ডিলার নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আগস্ট মাসে মূল ডিলারের কাছ থেকে পাওয়া সার মাসের প্রথম ১০ দিনেই শেষ হয়ে যায়। এরপর অন্য জেলা থেকে সার সংগ্রহ করতে হয়েছে। এতে অতিরিক্ত অর্থ খরচ হওয়ায় বিক্রয়মূল্যও বেড়ে যায় বলে দাবি করেন তিনি।
আরেক সাব-ডিলার অভিযোগ করেন, তাঁর ইউনিয়নের মূল ডিলারের কাছ থেকে পর্যাপ্ত সার না পাওয়ায় তাঁকে বিকল্পভাবে সার সংগ্রহ করতে হচ্ছে। এতে বাড়তি খরচের চাপ শেষ পর্যন্ত কৃষকদের ওপর পড়ছে।
তবে কৃষি বিভাগ সারের সংকটের অভিযোগ পুরোপুরি স্বীকার করছে না। রাজবাড়ী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের জেলা প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা গোলাম রসুল বলেন, জেলায় প্রয়োজন অনুযায়ী সার বরাদ্দ রয়েছে। তবে কৃষকরা জমিতে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি রাসায়নিক সার ব্যবহার করায় চাহিদা বেড়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, অতিরিক্ত সার ব্যবহারে একদিকে মাটির ক্ষতি হয়, অন্যদিকে কৃষকের উৎপাদন খরচও বাড়ে। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী সার ব্যবহারে কৃষকদের উৎসাহিত করা হচ্ছে।
তবে খুচরা পর্যায়ে সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগ পাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন এই কর্মকর্তা। তিনি জানান, অভিযোগের ভিত্তিতে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে জরিমানা করা হয়েছে। নির্ধারিত মূল্যের বেশি দামে সার বিক্রি করলে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সাদিয়া পারভিন / অনলাইন ডেস্ক / যোগফল.কম

আপনার মতামত লিখুন