মেয়েকে হারিয়ে বাবার আহাজারি, ‘আমার সবকিছুই শেষ’
যোগফল প্রতিবেদক:
এইচএসসি পরীক্ষা দিতে বাড়ি থেকে বের হয়ে আর পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছাতে পারেননি চট্টগ্রামের ১৮ বছর বয়সী নাফিসা নাওয়াল। পথে টোয়িং ট্রাকের ধাক্কায় গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে নেওয়ার পর তাঁর মৃত্যু হয়। একমাত্র মেয়েকে হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়েছেন বাবা মামুন মিয়া।
শনিবার (২২ আগস্ট) সকালে চট্টগ্রাম নগরের পতেঙ্গা থানার নেভি হাসপাতাল গেটের বিপরীতে সড়কে এ দুর্ঘটনা ঘটে। নাফিসা অ্যাপভিত্তিক মোটরসাইকেল সেবায় করে পরীক্ষা দিতে যাচ্ছিলেন। পথে একটি টোয়িং ট্রাকের ধাক্কায় তিনি সড়কে ছিটকে পড়ে গুরুতর আহত হন। পরে এক শিক্ষানবিশ চিকিৎসক তাঁকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
মেয়ের লাশের পাশে দাঁড়িয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বাবা মামুন মিয়া বলেন, ‘আমার সবকিছুই শেষ। ওকে নিয়ে অনেক আশা ছিল। লেখাপড়া করাচ্ছিলাম, ভেবেছিলাম ভালো কিছু করবে। পরীক্ষা শেষ হলে ওকে ডিফেন্সে দেওয়ার চিন্তাও করেছিলাম। কিন্তু পরীক্ষার কয়েকটি দিন বাকি থাকতেই সব শেষ হয়ে গেল।’
নাফিসা চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন। নগরের কাঠগড় এলাকায় পরিবারের সঙ্গে বসবাস করতেন তিনি। তাঁদের গ্রামের বাড়ি বরগুনা জেলায়। পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রমেও সক্রিয় ছিলেন নাফিসা। কলেজের ‘অগ্রণী হাউসের’ দলনেত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতেন।
নাফিসার মৃত্যুর খবর পেয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছুটে যান তাঁর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উপাধ্যক্ষ ববি বড়ুয়া। তিনি বলেন, নাফিসা খুব ভদ্র, সাদামাটা ও প্রাণচঞ্চল স্বভাবের মেয়ে ছিলেন। একবার একটি বিষয় নিয়ে তাঁর সঙ্গে দীর্ঘ সময় কথা হয়েছিল। তখন থেকেই নাফিসার সঙ্গে তাঁর ভালো সখ্য তৈরি হয়েছিল।
ববি বড়ুয়া বলেন, নাফিসা বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলতেন এবং নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ইতিবাচক চিন্তা করতেন। পড়াশোনার পাশাপাশি সহশিক্ষা কার্যক্রমেও তাঁর আগ্রহ ছিল। একটি লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতা ছিল নাফিসার মধ্যে।
বন্যা ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে গত ৮ জুলাই থেকে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিত ছিল। গত বৃহস্পতিবার থেকে স্থগিত পরীক্ষাগুলো আবার শুরু হয়। শনিবার তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিষয়ের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এই পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা ছিল নাফিসারও। তবে পরীক্ষা শুরুর আগেই সড়ক দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়।
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, শনিবারের পরীক্ষায় মোট ৮১ হাজার ৩৩৬ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেওয়ার কথা ছিল। এর মধ্যে ২ হাজার ৪৩৮ জন অনুপস্থিত ছিলেন। চট্টগ্রাম জেলায় অনুপস্থিত ছিলেন ১ হাজার ৬০৪ জন, তাঁদের একজন ছিলেন নাফিসা নাওয়াল।
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী নাফিসার মৃত্যুর ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, সকালে খবরটি জানার পর তাঁরা মর্মাহত হয়েছেন। নাফিসার জন্য সবার কাছে দোয়া কামনা করেন তিনি।
পুলিশ জানায়, দুর্ঘটনায় ব্যবহৃত যানটি একটি টোয়িং ট্রাক। সাধারণত বিকল বা দুর্ঘটনাকবলিত যানবাহন সরিয়ে নিতে এ ধরনের ট্রাক ব্যবহার করা হয়। দুর্ঘটনার পর ট্রাকের চালক পালিয়ে যান।
এ ঘটনায় নাফিসার বাবা মামুন মিয়া বাদী হয়ে চট্টগ্রাম ইপিজেড থানায় মামলা করেছেন। মামলায় টোয়িং ট্রাকের চালককে আসামি করা হয়েছে। তাঁকে গ্রেপ্তারে পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম ইপিজেড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ আতিকুর রহমান।
সাদিয়া পারভিন / অনলাইন ডেস্ক / যোগফল.কম

আপনার মতামত লিখুন