যোগফল প্রতিবেদক:
মেনোপজের পর যেকোনো ধরনের রক্তপাতকে স্বাভাবিক হিসেবে না দেখার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এটি জরায়ুর ভেতরের আবরণে হওয়া এন্ডোমেট্রিয়াল ক্যানসারের গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত হতে পারে।
এন্ডোমেট্রিয়াল ক্যানসার জরায়ুর ভেতরের আবরণে শুরু হয়। উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে নারীদের মধ্যে এটি সবচেয়ে বেশি দেখা গাইনোকলজিক্যাল ক্যানসারগুলোর একটি। বিশ্বজুড়ে এ রোগে আক্রান্তের সংখ্যাও বাড়ছে।
গ্লোবোক্যান ২০২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বে ৪ লাখ ৩৪ হাজার ৬২০ জন নতুন করে এন্ডোমেট্রিয়াল ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছেন। এ রোগে মারা গেছেন ১ লাখ ৬৮০ জন। সব ধরনের ক্যানসারের মধ্যে আক্রান্তের সংখ্যার হিসাবে এটি ১৬তম অবস্থানে রয়েছে।
ভারতে ২০২৪ সালে এ রোগে আক্রান্ত হয়েছেন ২৮ হাজার ৩০৮ জন এবং মারা গেছেন ৬ হাজার ৩৬২ জন।
যেসব লক্ষণে সতর্ক হবেন
এন্ডোমেট্রিয়াল ক্যানসারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হলো অস্বাভাবিক জরায়ু রক্তপাত। বিশেষ করে মেনোপজের পর যেকোনো ধরনের রক্তপাত দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
মেনোপজের আগে অনিয়মিত বা স্বাভাবিকের তুলনায় অতিরিক্ত রক্তপাতও এ রোগের লক্ষণ হতে পারে। এ ছাড়া পানির মতো বা রক্তমিশ্রিত যোনিপথের স্রাব, তলপেটে ব্যথা বা চাপ অনুভূত হওয়া, অকারণে ওজন কমে যাওয়া, পেট ফাঁপা এবং দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তিও দেখা দিতে পারে।
যেসব কারণে ঝুঁকি বাড়ে
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থূলতা, ডায়াবেটিস, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব এবং মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধির কারণে এ রোগের প্রকোপ বাড়ছে।
স্থূলতা, কখনো গর্ভধারণ না হওয়া, অল্প বয়সে মাসিক শুরু হওয়া, দেরিতে মেনোপজ হওয়া, পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (পিসিওএস), শুধু ইস্ট্রোজেনযুক্ত হরমোন থেরাপি এবং ট্যামোক্সিফেন ব্যবহারের সঙ্গে এন্ডোমেট্রিয়াল ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ার সম্পর্ক রয়েছে।
টাইপ-২ ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপও ঝুঁকি বাড়াতে পারে। অন্যদিকে নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা এবং কিছু ধরনের মুখে খাওয়ার গর্ভনিরোধক ব্যবহারের সঙ্গে তুলনামূলক কম ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
জেনেটিক কারণও রয়েছে
এন্ডোমেট্রিয়াল ক্যানসারের ক্ষেত্রে বংশগত কারণও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে লিঞ্চ সিনড্রোম থাকলে এ রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে।
লিঞ্চ সিনড্রোম ডিএনএ মেরামতের সঙ্গে জড়িত কিছু জিনের পরিবর্তনের কারণে হওয়া একটি বংশগত রোগ। এ সিনড্রোমে আক্রান্ত নারীদের জীবদ্দশায় এন্ডোমেট্রিয়াল ক্যানসারের ঝুঁকি ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।
যেভাবে শনাক্ত করা হয়
অস্বাভাবিক রক্তপাতের সমস্যা নিয়ে চিকিৎসকের কাছে গেলে সাধারণত সেখান থেকেই রোগ নির্ণয়ের প্রক্রিয়া শুরু হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত করা গেলে চিকিৎসায় ভালো ফল পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
সাধারণত ট্রান্সভ্যাজাইনাল আল্ট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে পরীক্ষা শুরু করা হয়। প্রয়োজন হলে এন্ডোমেট্রিয়াল বায়োপসি করা হয়। কিছু ক্ষেত্রে হিস্টেরোস্কপি বা ডাইলেশন অ্যান্ড কিউরেটাজের মাধ্যমে নমুনা সংগ্রহ করা হতে পারে।
ক্যানসার শনাক্ত হওয়ার পর টিউমারের গ্রেড, গঠনগত বৈশিষ্ট্য ও মলিকিউলার ধরন নির্ধারণ করা হয়। টিউমার জরায়ুর দেয়ালে কতটা ছড়িয়েছে তা জানতে পেলভিক এমআরআই এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সিটি স্ক্যান করা হতে পারে।
চিকিৎসা কী
এন্ডোমেট্রিয়াল ক্যানসারের চিকিৎসা রোগের ধরন ও পর্যায়ের ওপর নির্ভর করে। সাধারণত অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে জরায়ু অপসারণের পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী ফ্যালোপিয়ান টিউব, ডিম্বাশয় ও লিম্ফ নোড পরীক্ষা বা অপসারণ করা হয়।
প্রাথমিক পর্যায়ের কম ঝুঁকির ক্যানসারে অনেক ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারই যথেষ্ট হতে পারে। তবে রোগের ঝুঁকি বা পর্যায় অনুযায়ী রেডিওথেরাপি, কেমোথেরাপি এবং নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে ইমিউনোথেরাপির প্রয়োজন হতে পারে।
তাই মেনোপজের পর রক্তপাত হলে তা অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। দ্রুত শনাক্তকরণ এ রোগের চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তানজিলা / অনলাইন
ডেস্ক / যোগফল.কম
আপনার মতামত লিখুন