নিজস্ব প্রতিবেদক:
মন্দিরের পাঠশালায় প্রথমে বাবা, পরে ছেলের ‘হাতেখড়ি’ দিয়েছেন রমণী কান্ত বেপারি। একই পাঠশালায় এখন আরেক প্রজন্মের শিশুরাও তার হাত ধরে পড়াশোনার শুরু করছে। দীর্ঘ ৬৩ বছর ধরে গ্রামের শিশু-কিশোরদের শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়া এই শিক্ষক কখনো নির্দিষ্ট পারিশ্রমিক নেননি। অভিভাবকরা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী মাস শেষে যা দেন, তাতেই সন্তুষ্ট তিনি।
বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার রাজিহার ইউনিয়নের রাংতা গ্রামের রাখাল বেপারীর ছেলে রমণী কান্ত বেপারি। দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে অসংখ্য শিশুকে প্রাথমিক শিক্ষার হাতেখড়ি দেওয়া এই গুণী শিক্ষক এবার জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সরকারি সম্মাননা পাচ্ছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, রাংতা সার্বজনীন দুর্গা মন্দিরের আঙিনায় গড়ে ওঠা পাঠশালায় নিয়মিত শিশুদের পাঠদান করছেন রমণী কান্ত বেপারি। শুক্রবার ছাড়া সপ্তাহের ছয় দিন সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত তিনি শিক্ষার্থীদের পড়ান। বর্তমানে তার পাঠশালায় ২০ থেকে ২৫ জন শিক্ষার্থী রয়েছে।
চাকরির সুযোগ ছেড়ে পাঠশালায়
জানা যায়, ১৯৭১ সালের আগেই স্কুলছাত্র থাকা অবস্থায় এলাকার দরিদ্র ও অসহায় পরিবারের সন্তানদের পড়ানো শুরু করেন রমণী কান্ত। ১৯৭৩ সালে এসএসসি পাস করার পর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার চাকরির সুযোগ পান তিনি। তবে ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের প্রতি মায়া ও ভালোবাসার কারণে সেই চাকরির সুযোগ স্বেচ্ছায় ছেড়ে দেন।
এরপর থেকে মন্দিরের আঙিনার পাঠশালাকেই নিজের কর্মস্থল হিসেবে বেছে নেন তিনি। তার কাছে হাতেখড়ি নেওয়া অনেক শিক্ষার্থী বর্তমানে দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করছেন।
শিক্ষার্থীর অভিভাবক শিপ্রা পাত্র বলেন, ‘আমার মেয়েকে পড়িয়েছেন রমণী স্যার। বয়স হয়ে গেলেও স্যার এখনো অত্যন্ত দক্ষ এবং যত্নসহকারে ছেলে-মেয়েদের পড়ান।’
আরেক অভিভাবক কমল মণ্ডল বলেন, ‘স্যারের কাছে আমার বাবা হাতেখড়ি নিয়েছেন। পরে আমিও পড়েছি। আমার সন্তানকেও পড়িয়েছি। আমার সন্তান এখন স্কুলে পড়ে। কিন্তু এখনো রমণী স্যারের পাঠশালার মায়া ছাড়তে পারেনি।’
সাধারণ জীবনযাপন
স্ত্রী রুম্পাকে নিয়ে রমণী কান্ত বেপারির সংসার। একমাত্র ছেলে তাপস বেপারি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। বাড়িতে একটি দোচালা টিনের ঘরেই বসবাস করেন তারা। রমণী কান্তের কিছু কৃষিজমি রয়েছে। পাশাপাশি সরকারি বয়স্ক ভাতাও পান তিনি।
রমণী কান্ত বেপারি বলেন, ‘ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের পড়িয়ে আমি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। তাদের স্বজনরা যা দেন, তাতেই চলে যায়। জীবনের শেষ মুহূর্তে এসেছি। এখন সরকার আমাকে যে গুণী শিক্ষক সম্মাননা দিচ্ছে, সেটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া। প্রধানমন্ত্রীর এই সম্মাননার প্রতি সম্মান জানিয়ে যতদিন বেঁচে আছি, এ পেশায় থেকে মরতে চাই। এতেই আমার শান্তি।’
রাংতা সার্বজনীন দুর্গা মন্দির কমিটির সভাপতি রনজিত বৈদ্য বলেন, ‘স্বাধীনতা যুদ্ধের অনেক আগেই মন্দিরের আঙিনায় গ্রামের শিশু-কিশোরদের জন্য পাঠশালা চালু করেন রমণী কান্ত বেপারি। দেখতে দেখতে প্রায় ৬৩ বছর কেটে গেছে। তার কারণে এলাকার গরিব ও অসহায় পরিবারের ছেলে-মেয়েরা লেখাপড়ার সুযোগ পাচ্ছে।’
আগৈলঝাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নিরুপম মজুমদার বলেন, ‘শিক্ষক রমণী কান্ত বেপারির বিষয়টি আমি কিছুদিন আগেই জেনেছি। আমি তার পাঠশালা পরিদর্শন করেছি। তিনি সরকারি সহযোগিতা হিসেবে বয়স্ক ভাতা পান। সবচেয়ে খুশির বিষয় হলো, এবারের বিশ্ব শিক্ষক দিবসে যে ১০১ জন গুণী শিক্ষক সম্মাননা পাচ্ছেন, তাদের মধ্যে একজন রমণী কান্ত বেপারি। প্রধানমন্ত্রী তাকে সম্মাননা প্রদান করবেন। এটা তার শিক্ষকতা জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া বলে আমি মনে করি।
তুলি আক্তার/ অনলাইন ডেস্ক / যোগফল. কম
আপনার মতামত লিখুন