যোগফল প্রতিবেদক:
অভিনয়ের মাধ্যমে কখনো দর্শকদের কাঁদিয়েছেন, কখনো হাসিয়েছেন। কখনো প্রতিবাদী যুবক, কখনো নিঃশব্দ প্রেমিক, আবার কখনো সাদামাটা গ্রামের মানুষের চরিত্রে নিজেকে মেলে ধরেছেন তিনি। ঢাকাই চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় অভিনেতা আকবর হোসেন পাঠান ফারুক তাই দর্শকের কাছে আজও ‘মিয়া ভাই’ নামেই পরিচিত।
আজ ১৮ আগস্ট প্রয়াত এই কিংবদন্তি অভিনেতার জন্মদিন। বিশেষ এই দিনে ফিরে দেখা যায় তাঁর অভিনয়জীবনের সেই বৈশিষ্ট্য, যা তাঁকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করে তুলেছিল।
১৯৭১ সালে এইচ আকবর পরিচালিত ‘জলছবি’ সিনেমার মাধ্যমে চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় ফারুকের। তবে দর্শকের ব্যাপক পরিচিতি পান খান আতাউর রহমান পরিচালিত ‘সুজন সখী’ সিনেমায় অভিনয়ের মাধ্যমে। ১৯৭৫ সালের এই সিনেমায় সুজন চরিত্রে তাঁর স্বাভাবিক ও আবেগঘন অভিনয় দর্শকদের নজর কাড়ে। তাঁর বিপরীতে অভিনয় করেছিলেন কবরী।
এরপর আমজাদ হোসেনের ‘নয়নমনি’ সিনেমায় নয়ন চরিত্রে অভিনয় করে নিজের অবস্থান আরও শক্ত করেন ফারুক। গ্রামীণ এক যুবকের চরিত্রে তাঁর সহজাত অভিনয় দর্শকের মনে গভীর ছাপ ফেলে। পরবর্তীতে ‘সারেং বউ’, ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’, ‘লাঠিয়াল’, ‘লাল কাজল’সহ একাধিক সিনেমায় গ্রামীণ মানুষের চরিত্রে অভিনয় করে তিনি হয়ে ওঠেন অনন্য।
ফারুকের অভিনয়ের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল গ্রামীণ মানুষের আবেগ, প্রতিবাদ, জেদ ও ভালোবাসাকে অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে পর্দায় তুলে ধরা। চলচ্চিত্রের শিক্ষক ও নির্মাতা মতিন রহমানের মতে, ফারুক গ্রামীণ মানুষের স্বভাবগত জিদ, তাড়না ও প্রতিবাদের ভাষা অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারতেন। তাঁর অভিনয়ের এই সহজাত ভঙ্গিই তাঁকে অন্য শিল্পীদের থেকে আলাদা করেছে।
‘গোলাপী এখন ট্রেনে’ সিনেমার একটি দৃশ্য তাঁর অভিনয়প্রতিভার উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে আছে। সিনেমায় মিলন চরিত্রে অভিনয় করা ফারুককে বিষ খাওয়ানো হয়। বিষক্রিয়ার যন্ত্রণা মুখের অভিব্যক্তির মাধ্যমে প্রায় আড়াই মিনিটের একটি দৃশ্যে ফুটিয়ে তুলেছিলেন তিনি। সংলাপ ছাড়াই তাঁর অভিনয় দর্শকদের আবেগাপ্লুত করেছিল।
সত্তর ও আশির দশককে ফারুকের ক্যারিয়ারের স্বর্ণসময় বলা হয়। সে সময় গ্রামীণ পটভূমির কোনো গল্প নিয়ে সিনেমা নির্মাণের পরিকল্পনা হলে পরিচালকদের পছন্দের তালিকায় থাকতেন ফারুক। তাঁর অভিনীত ‘নয়নমনি’, ‘সুজন সখী’, ‘সারেং বউ’ ও ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’সহ বহু সিনেমা আজও দর্শকের কাছে স্মরণীয়।
ফারুকের জনপ্রিয় ‘মিয়া ভাই’ পরিচয়ের পেছনেও রয়েছে তাঁর অভিনয়ের স্বকীয়তা। চরিত্রকে শুধু অভিনয় না করে নিজের মধ্যে ধারণ করতেন তিনি। পর্দায় তাঁর আচরণ, কথা বলার ধরন ও স্বাভাবিক অভিনয় দর্শকের কাছে তাঁকে আপন করে তুলেছিল।
তবে আশির দশকের শেষভাগ থেকে বাংলা সিনেমায় গ্রামীণ পটভূমির গল্প ধীরে ধীরে কমতে থাকে। সিনেমার গল্পে শহুরে জীবন, চাকচিক্য ও নতুন ধরনের উপস্থাপনা জায়গা করে নেয়। ফলে ফারুকের মতো গ্রামীণ চরিত্রে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অভিনয় করতে পারা নায়কদের জন্যও সুযোগ কমে যায়।
ফারুকের জন্ম মানিকগঞ্জের ঘিওরের এক গ্রামে হলেও তাঁর বেড়ে ওঠা পুরান ঢাকায়। ছোটবেলা থেকেই তিনি পুরান ঢাকার সাংস্কৃতিক পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এইচ আকবর, এ টি এম শামসুজ্জামান ও প্রবীর মিত্রের মতো শিল্পী-নির্মাতাদের সংস্পর্শ তাঁর অভিনয়জীবনকে সমৃদ্ধ করে। বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে মেশার অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে চরিত্র নির্মাণে তাঁকে সহায়তা করেছে।
দীর্ঘ অভিনয়জীবনে ফারুক পেয়েছেন নানা স্বীকৃতি। ‘লাঠিয়াল’ সিনেমার জন্য ১৯৭৫ সালে শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেতার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন তিনি। পরে ২০১৬ সালে অভিনয়ে অসামান্য অবদানের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে আজীবন সম্মাননায় ভূষিত হন।
অভিনয়ের পাশাপাশি রাজনীতিতেও সক্রিয় ছিলেন ফারুক। তিনি ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। প্রায় পাঁচ দশকের বর্ণিল ক্যারিয়ার শেষে ২০২৩ সালের ১৫ মে না-ফেরার দেশে পাড়ি জমান এই কিংবদন্তি অভিনেতা।
তবে পর্দায় তাঁর রেখে যাওয়া চরিত্রগুলো এখনো দর্শকের মনে জীবন্ত। গ্রামের সহজ-সরল মানুষ থেকে প্রতিবাদী যুবক—বিভিন্ন চরিত্রে ফারুকের অভিনয় তাঁকে বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে স্বতন্ত্র এক অবস্থান দিয়েছে। আর সেই কারণেই তিনি শুধু একজন অভিনেতা নন, দর্শকের কাছে চিরকালীন ‘মিয়া ভাই’।
সাদিয়া পারভিন / অনলাইন ডেস্ক / যোগফল.কম
আপনার মতামত লিখুন