যোগফল প্রতিবেদক:
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জোরপূর্বক গুমের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ অন্যতম। ২০১৫ সালের ১০ মার্চ রাজধানীর উত্তরার একটি ফ্ল্যাট থেকে তাকে তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে। প্রায় দুই মাস নিখোঁজ থাকার পর ভারতের মেঘালয় রাজ্যের রাজধানী শিলংয়ে তার সন্ধান পাওয়া যায়।
আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে দীর্ঘদিন আগের সেই আলোচিত ঘটনার নানা তথ্য নতুন করে সামনে এসেছে। গুম হওয়ার আগে সালাহউদ্দিন আহমদ কোথায় ছিলেন, কীভাবে তাকে উত্তরার ওই ফ্ল্যাটে নেওয়া হয়েছিল এবং ঘটনার দিন সেখানে কী ঘটেছিল—এসব বিষয়ে চাঞ্চল্যকর বর্ণনা দিয়েছেন ওই ফ্ল্যাটের মালিক ও তার ঘনিষ্ঠজন সৈয়দ হাবিব হাসনাত।
২০১৫ সালের শুরুতে বিএনপির সরকারবিরোধী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ওই সময় দলের সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ গ্রেপ্তার হওয়ার পর বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমদকে দলের মুখপাত্রের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি বিভিন্ন স্থান থেকে দলীয় কর্মসূচি ও আন্দোলনের বিষয়ে বিবৃতি ও ভিডিও বার্তা দিতেন।
সৈয়দ হাবিব হাসনাতের ভাষ্য অনুযায়ী, সে সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সালাহউদ্দিন আহমদকে খুঁজছিল। নিরাপত্তার কারণে তিনি গুলশানের বিভিন্ন ফ্ল্যাটে অবস্থান পরিবর্তন করে দলীয় কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
হাবিব হাসনাত জানান, গুলশান এলাকায় গোয়েন্দা তৎপরতা বেড়ে যাওয়ার পর সালাহউদ্দিনকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। একদিন দুপুরে সালাহউদ্দিন তাকে ফোন করে দ্রুত গুলশান ছাড়ার কথা জানান এবং তার উত্তরার ফ্ল্যাটে থাকার আগ্রহ প্রকাশ করেন।
পরে বিকেলে হাবিব হাসনাত নিজেই গাড়ি নিয়ে গুলশান থেকে সালাহউদ্দিনকে নিয়ে আসেন। তার সঙ্গে বিএনপি নেতা তাবিথ আউয়ালও ছিলেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়াতে তারা পুলিশের চেকপোস্ট এড়িয়ে বিকল্প সড়ক ব্যবহার করে উত্তরায় পৌঁছান।
উত্তরার ফ্ল্যাটে যাওয়ার সময় নিরাপত্তাকর্মীদের সন্দেহ এড়াতে হাবিব হাসনাত কৌশলের আশ্রয় নেন। তিনি দারোয়ানকে বাইরে পাঠিয়ে সালাহউদ্দিন ও তাবিথ আউয়ালকে দ্রুত ফ্ল্যাটে উঠিয়ে দেন। সেখানে আগে থেকেই একজন বাবুর্চি ও সহকারীকে রাখা হয়েছিল।
হাবিব হাসনাতের দাবি, এরপর ওই ফ্ল্যাট থেকেই সালাহউদ্দিন আহমদ বিএনপির আন্দোলন অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়ে বিভিন্ন বিবৃতি ও ভিডিও বার্তা পাঠাতেন।
১০ মার্চের সেই রাত
হাবিব হাসনাতের বর্ণনা অনুযায়ী, ১০ মার্চ সন্ধ্যার পর তিনি উত্তরার ওই এলাকায় গেলে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি দেখতে পান। কয়েকটি সড়কের বাতি বন্ধ ছিল, দোকানপাটও ছিল বন্ধ। এমনকি এলাকার খেলার মাঠগুলোতেও সাধারণ সময়ের মতো মানুষের উপস্থিতি ছিল না।
বাড়ির কাছে গিয়ে তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের অবস্থান দেখতে পান। বাড়ির ভেতরে ঢুকে তিনি দারোয়ানকে মনমরা অবস্থায় দেখতে পান। পরে ফ্ল্যাটের দরজার কাছে গিয়ে দেখতে পান, দরজা ভাঙা।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে থাকা বাবুর্চি ও সহকারী কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, ‘মেহমানকে তুলে নিয়ে গেছে।’
এরপর নিজের নিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কিত হয়ে পড়েন হাবিব হাসনাত। তিনি দ্রুত দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে বিমানবন্দরে চলে যান। পরে দুবাই বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর উত্তরার থানার তৎকালীন ওসির ফোন পান বলে দাবি করেন তিনি।
বিদেশে গিয়েও নীরব থাকার হুমকি
হাবিব হাসনাত জানান, পরে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান নেন। সেখান থেকে সালাহউদ্দিন আহমদের স্ত্রী হাসিনা আহমেদ এবং বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল।
তার দাবি, সালাহউদ্দিনকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তুলে নেয়নি—তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকে এমন বক্তব্য দেওয়া হচ্ছিল। বরং তিনি আত্মগোপনে গেছেন বলে প্রচার করা হয়।
হাবিব হাসনাত বলেন, একপর্যায়ে খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকে তাকে যুক্তরাষ্ট্র বা দুবাইয়ে সংবাদ সম্মেলন করে সালাহউদ্দিনকে তার উত্তরার ফ্ল্যাট থেকে তুলে নেওয়ার বিষয়টি জানানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। তিনি সে অনুযায়ী প্রস্তুতিও নিচ্ছিলেন। তবে পরে গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে তাকে চুপ থাকার জন্য ফোনে হুমকি দেওয়া হয় বলে তার দাবি। এরপর তিনি আর সংবাদ সম্মেলন করেননি।
গুমের আগে কয়েক দফা অভিযান
সালাহউদ্দিন আহমদকে তুলে নেওয়ার আগে ৭ মার্চ তার দুই চালক শফিক ও খোকন এবং ব্যক্তিগত সহকারী ওসমান গণিকে র্যাব গ্রেপ্তার করে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরদিন ৮ মার্চ সালাহউদ্দিনের সন্ধানে গুলশানের ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক এবং ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ফ্ল্যাটে র্যাব তল্লাশি চালায়। ওই অফিস ও ফ্ল্যাটের মালিক ছিলেন সৈয়দ হাবিব হাসনাত।
এরপর ১০ মার্চ উত্তরার ফ্ল্যাট থেকে সালাহউদ্দিন আহমদকে তুলে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এর আগে গুলশানে তিনি যে বাসায় অবস্থান করছিলেন, সেখানেও একাধিকবার তল্লাশি চালানো হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।
ঘটনার পর ঢাকার বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রত্যক্ষদর্শী ও নিরাপত্তাকর্মীদের বরাতে খবর প্রকাশিত হয়। সেখানে বলা হয়, সালাহউদ্দিনকে তুলে নেওয়ার সময় ওই এলাকার কাছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি পিকআপ অবস্থান করছিল। তবে তাকে কারা তুলে নিয়ে গেছে, সে বিষয়ে সে সময় সরকারি কোনো সংস্থা দায় স্বীকার করেনি।
৬২ দিন পর শিলংয়ে সন্ধান
২০১৫ সালের ১০ মার্চ নিখোঁজ হওয়ার পর প্রায় ৬২ দিন পর ভারতের মেঘালয় রাজ্যের রাজধানী শিলংয়ে সালাহউদ্দিন আহমদের সন্ধান পাওয়া যায়। তাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থায় পাওয়া যায় বলে সে সময় বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল।
তবে তার নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাকে ঘিরে তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকে ভিন্ন বক্তব্যও দেওয়া হয়েছিল। সে সময় শেখ হাসিনা এবং সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী-এমপি দাবি করেছিলেন, সালাহউদ্দিন আত্মগোপনে থাকতে পারেন।
অন্যদিকে তার পরিবার ও বিএনপির পক্ষ থেকে শুরু থেকেই দাবি করা হয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীই তাকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল।
সালাহউদ্দিন আহমদের নিখোঁজ ও পরে ভারতে সন্ধান পাওয়ার ঘটনা বাংলাদেশের রাজনীতিতে বহুল আলোচিত একটি ঘটনা হয়ে আছে। আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসের প্রেক্ষাপটে সেই ঘটনার নতুন বর্ণনা আবারও সামনে আনল দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত প্রশ্নগুলো।
তানজিলা / অনলাইন
ডেস্ক / যোগফল.কম
আপনার মতামত লিখুন