ছোট্ট ডানায় প্রকৃতির রঙিন দূত ‘পাতি জহুর’ প্রজাপতি
প্রকৃতির সৌন্দর্যকে আরও মোহনীয় করে তোলে রঙিন ডানার প্রজাপতি। ফুলে ফুলে উড়ে বেড়ানো এসব কোমল প্রাণী শুধু চোখ জুড়ানো সৌন্দর্যেরই প্রতীক নয়, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায়ও পালন করে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। তেমনি পরিচিত একটি প্রজাতি হলো পাতি জহুর, যা সূর্যচঞ্চল নামেও পরিচিত।
পাতি জহুরের বৈজ্ঞানিক নাম পেলোপিডাস ম্যাথিয়াস (Pelopidas mathias)। এটি হেসপারিডি (স্কিপার) পরিবারের একটি ছোট আকৃতির প্রজাপতি। দ্রুতগতির উড়ান, ছোট্ট ডানার আকর্ষণীয় নকশা এবং জলপাই-বাদামি আভাযুক্ত রঙের কারণে সহজেই নজর কাড়ে এ প্রজাতি। পূর্ণবয়স্ক প্রজাপতির ডানার বিস্তার সাধারণত ৩২ থেকে ৩৮ মিলিমিটার। ডানায় ছড়িয়ে থাকে ছোট ছোট সাদা বা হলদেটে অর্ধস্বচ্ছ ছোপ, যা একে অন্য প্রজাতি থেকে আলাদা করে।
বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা ও মিয়ানমারের বিভিন্ন অঞ্চলে এ প্রজাপতির দেখা মেলে। ধানক্ষেত, তৃণভূমি, ঝোপঝাড়, বনাঞ্চল, বাগান, পতিত জমি কিংবা নগর উদ্যান—প্রায় সব ধরনের পরিবেশেই এদের বিচরণ রয়েছে। মার্চ থেকে নভেম্বর পর্যন্ত এদের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। বিশেষ করে সকাল ও বিকেলের দিকে এরা সবচেয়ে সক্রিয় থাকে।
পাতি জহুর ফুলের মধু পান করলেও ভেজা মাটি, স্যাঁতসেঁতে পাথর কিংবা পাখির বিষ্ঠা থেকে প্রয়োজনীয় খনিজ লবণ সংগ্রহ করে। মাঝে মধ্যেই পাতার ওপর ডানা আংশিক মেলে সূর্যের আলোয় বসে থাকতে দেখা যায় এ প্রজাপতিকে, যা প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে এক অনন্য দৃশ্য।
তবে এই প্রজাপতির আরেকটি পরিচয়ও রয়েছে। পূর্ণাঙ্গ প্রজাপতি পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর না হলেও এর শূককীট ধান, আখ, লেবুঘাস, উলুঘাসসহ বিভিন্ন ঘাসজাতীয় উদ্ভিদের পাতা খেয়ে ফসলের ক্ষতি করতে পারে। এ কারণে কৃষিবিজ্ঞানে এটি ধানের একটি পরিচিত ক্ষতিকর পোকা হিসেবে বিবেচিত হয় এবং অনেক সময় রাইস স্কিপার নামেও পরিচিত।
স্ত্রী পাতি জহুর সাধারণত ধান বা ঘাসজাতীয় গাছের পাতায় একটি করে ডিম পাড়ে। তিন থেকে চার দিনের মধ্যে ডিম ফুটে শূককীট বের হয়। পরে পাতাকে ভাঁজ করে নিজের আশ্রয় তৈরি করে কয়েক ধাপে খোলস বদলে পুত্তলিতে পরিণত হয়। প্রায় এক সপ্তাহ পর সেই পুত্তলি থেকে জন্ম নেয় নতুন একটি প্রজাপতি।
স্থানীয় মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. জামাল হোসেন বলেন, প্রজাপতি শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য বাড়ায় না, এটি একটি সুস্থ বাস্তুতন্ত্রেরও গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক। কোনো এলাকায় প্রজাপতির বৈচিত্র্য বেশি থাকলে সেখানে জীববৈচিত্র্যের পরিবেশও সমৃদ্ধ থাকে। তাই তাদের আবাসস্থল রক্ষা এবং শিক্ষার্থীদের প্রকৃতি সম্পর্কে সচেতন করে তোলা সময়ের দাবি।
অন্যদিকে ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. আব্দুল মতিন বলেন, পূর্ণাঙ্গ পাতি জহুর প্রজাপতি পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর নয়। তবে এর শূককীট ধানের পাতার ক্ষতি করতে পারে। তাই কৃষকদের নিয়মিত জমি পর্যবেক্ষণ করতে হবে এবং অপ্রয়োজনে কীটনাশক ব্যবহার না করে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে উপকারী ও অপকারী পোকামাকড়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা উচিত।
প্রকৃতির রঙিন এই ছোট্ট দূত তাই একদিকে যেমন সৌন্দর্যের প্রতীক, অন্যদিকে কৃষির বাস্তবতায়ও বহন করে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণীর মতো পাতি জহুর সম্পর্কেও সঠিক জ্ঞান ও সচেতনতাই পারে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং টেকসই কৃষি ব্যবস্থাকে আরও সমৃদ্ধ করতে।
সাদিয়া পারভিন / অনলাইন ডেস্ক / যোগফল.কম

আপনার মতামত লিখুন