যোগফল প্রতিবেদক:
প্রকৃতি যেন তার সব সম্ভাবনা নিয়ে হাজির হয়েছে কক্সবাজারের নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলায়। একদিকে বিস্তীর্ণ লবণ মাঠ, অন্যদিকে নীল জলে বাগদা চিংড়ির চাষ। এর মাঝেই ধান ও সরিষার সবুজ-সোনালি ফসলের সমারোহ। নদী, উপকূল, কৃষি, মৎস্য ও লবণ—সব মিলিয়ে মাতামুহুরী হয়ে উঠতে পারে দেশের উপকূলীয় অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল।
চকরিয়া উপজেলা থেকে পৃথক হয়ে গড়ে ওঠা মাতামুহুরীর অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি কৃষি, চিংড়ি ও মৎস্যচাষ, লবণ উৎপাদন এবং উপকূলীয় ব্যবসা। বিশেষ করে চিংড়ি চাষ দীর্ঘদিন ধরে এ অঞ্চলের মানুষের জীবিকা ও স্থানীয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখানকার উৎপাদিত বাগদা চিংড়ি দেশের বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রের মাধ্যমে বিদেশের বাজারেও যাচ্ছে।
জানা যায়, ষাটের দশকে জোয়ারের পানি নিয়ন্ত্রণে উপকূলীয় বেড়িবাঁধ নির্মাণের পর সত্তরের দশকে লোনাপানি আটকে চিংড়ি চাষ শুরু হয়। ১৯৭৬ সালে এ এলাকায় আধুনিক পদ্ধতিতে বাগদা চিংড়ি চাষের সূচনা হয়। পরে ১৯৭৮ সালে সরকারি জমি বন্দোবস্ত এবং ১৯৮২ সালে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে এ অঞ্চলে চিংড়ি চাষ আরও বিস্তৃত হয়।
বর্তমানে মাতামুহুরীর চিংড়ি দেশের বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রের মাধ্যমে ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে রপ্তানি হচ্ছে। এর মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়েও কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে। একই সঙ্গে বিস্তীর্ণ লবণ মাঠ দেশের লবণের চাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখছে। ফলে কৃষি ও মৎস্যের পাশাপাশি লবণ শিল্পও এ অঞ্চলের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি।
তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি রয়েছে নানা চ্যালেঞ্জ। মাতামুহুরী নদী স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকার অন্যতম উৎস হলেও বর্ষায় পাহাড়ি ঢল, অতিবৃষ্টি ও নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় প্রায়ই বন্যা ও জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। নোনা পানি ঢুকে কৃষিজমির ফসল নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় চিংড়িঘের। এ উপজেলায় প্রায় ১৪ হাজার ১৫৮ হেক্টর জমিতে চাষাবাদ হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এসব কৃষিজমি ক্রমেই নানা ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
চিংড়ি চাষেও রয়েছে একাধিক সমস্যা। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, রোগবালাই ও মড়ক, বাজারদরের ওঠানামা, মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব এবং ঘেরের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগে রয়েছেন অনেক চাষি।
চিংড়িচাষি মোহাম্মদ আলাউদ্দিন বলেন, চিংড়ি চাষে মাতামুহুরীর সম্ভাবনা অনেক। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি ঘেরের নিরাপত্তা নিয়েও আতঙ্কে থাকতে হয়। তার অভিযোগ, কখনো কখনো দুর্বৃত্তরা ঘেরে হামলা ও ভাঙচুর চালিয়ে মাছ লুট করে নিয়ে যায়। এ অবস্থায় প্রশাসনের নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি চাষিদের নিরাপত্তা ও সহযোগিতা চান তিনি।
সাহারবিল ইউনিয়নের কৃষক বেলাল উদ্দিন বলেন, বর্ষায় জলাবদ্ধতা ও লবণাক্ততার কারণে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। নদীর বাঁধ সংস্কারের পাশাপাশি পানি নিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা করা গেলে কৃষকদের দুর্ভোগ অনেকটাই কমবে।
চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাহানাজ ফেরদৌসী বলেন, কৃষকদের জলবায়ু-সহনশীল বীজ ও সার সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। পরিবর্তিত আবহাওয়ায় ফসল রক্ষায় মাঠপর্যায়ে প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় পরামর্শও দেওয়া হচ্ছে।
চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আনোয়ারুল আমিন বলেন, মৎস্য ও চিংড়ি খাতে মাতামুহুরীর ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, প্রশিক্ষণ এবং কারিগরি সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে এ খাত আরও সমৃদ্ধ হবে।
বিসিক কক্সবাজার লবণ শিল্প উন্নয়ন কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক জাফর ইকবাল ভূঁইয়া জানান, চলতি লবণ মৌসুম শেষ হওয়ায় মাতামুহুরী উপজেলার লবণ উৎপাদনের তথ্য পৃথকভাবে সংরক্ষণ করা হয়নি। আগামী মৌসুম থেকে এ উপজেলার উৎপাদনের তথ্য আলাদাভাবে পাওয়া যাবে। তবে মাতামুহুরী পৃথক উপজেলা হওয়ার আগে পুরো চকরিয়া উপজেলায় ২০২৫-২৬ মৌসুমে মোট ১ লাখ ১৯ হাজার ৪০০ মেট্রিক টন লবণ উৎপাদিত হয়েছে।
দীর্ঘদিন চকরিয়া উপজেলার ওপর প্রশাসনিকভাবে নির্ভরশীল থাকার পর মাতামুহুরী পৃথক উপজেলা হওয়ায় স্থানীয় মানুষের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। সাত ইউনিয়নের প্রায় তিন লাখ মানুষের প্রত্যাশা, নতুন উপজেলা প্রতিষ্ঠার ফলে যোগাযোগ, অবকাঠামো, সরকারি সেবা ও বিনিয়োগে গতি আসবে।
সচেতন মহলের মতে, শুধু প্রশাসনিক মর্যাদা পেলেই মাতামুহুরীর কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন নিশ্চিত হবে না। কৃষি, মৎস্য ও লবণভিত্তিক অর্থনীতিকে টেকসই করতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনা। স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ, খাল পুনঃখনন, জলাবদ্ধতা নিরসনে আধুনিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং নদী-জলাশয় ব্যবস্থাপনায় কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
সঠিক পরিকল্পনা, সরকারি বিনিয়োগ ও প্রশাসনিক সহযোগিতা নিশ্চিত করা গেলে নদী, উপকূল, কৃষি ও মৎস্যসম্পদে সমৃদ্ধ মাতামুহুরী ভবিষ্যতে দেশের উপকূলীয় ব্লু ইকোনমির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।
সাদিয়া পারভিন / অনলাইন ডেস্ক / যোগফল.কম
আপনার মতামত লিখুন